
সংশোধন ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ছাড়া প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন পাস করা হলে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের শীর্ষ ব্যক্তিদের সঙ্গে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, খসড়াটি প্রয়োজনীয় সংশোধন ছাড়া আইনে পরিণত হলে এর প্রভাব সমাজের বিভিন্ন স্তরে পড়তে পারে। তিনি এ বিষয়ে আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান।
সভায় ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেন, প্রস্তাবিত আইনটির খসড়া পর্যালোচনা করে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। বর্তমান কাঠামোতে আইনটি পাস হলে সংবাদমাধ্যমের কাজের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার খসড়াটি নিয়ে আরও আলোচনা ও মতামত দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা সন্তুষ্ট। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের নিয়ে পৃথক দুটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধনী ও সুপারিশ তৈরি করা যেতে পারে।
মাহফুজ আনাম বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে বর্তমানে মানুষ ও প্রতিষ্ঠান প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে সাইবার জগতের সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমেরও অনলাইন, মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল কার্যক্রম রয়েছে। ফলে সাইবার অপরাধ দমনের নামে এমন কোনো বিধান থাকা উচিত নয়, যার কারণে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকরা অযাচিতভাবে আইনি জটিলতায় পড়েন।
প্রস্তাবিত আইনে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ ও পরিভাষার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, কোনো বিধানের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলে সেটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধের জন্য দুই, পাঁচ ও ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান নিয়েও আলোচনা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মোবাইল কোর্টের বিধান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মাহফুজ আনাম। তার বক্তব্য, কোনো সাংবাদিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাকে তাৎক্ষণিকভাবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দণ্ড দেওয়ার সুযোগ থাকলে তা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, সাইবার নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়ে মোবাইল কোর্টের বিধান কীভাবে খসড়ায় যুক্ত হয়েছে, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনটির খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া ও এর পেছনে থাকা যুক্তিগুলো নিয়েও আরও আলোচনা দরকার।
মাহফুজ আনাম জানান, সরকার গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রিন্ট, টেলিভিশন, অনলাইন গণমাধ্যম এবং সাইবার বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধনী প্রস্তাব তৈরি করা হবে। এর লক্ষ্য হবে গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজের পরিবেশ বজায় রাখা।
একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান ও সিইও আব্দুস সালাম বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইনের আওতায় কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কারও পছন্দ না হওয়া কিংবা মানহানির অভিযোগ ওঠার কারণে সাংবাদিককে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর সুযোগ থাকা উচিত নয়।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ দমনে আইন প্রয়োজন। তবে কোনো সংবাদ প্রকাশের পর কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করলে যেন সাংবাদিক, সম্পাদক বা প্রতিষ্ঠানের মালিককে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার কিংবা শাস্তির মুখোমুখি হতে না হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
আব্দুস সালাম আরও বলেন, আইনের এমন প্রয়োগ হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সাইবার অপরাধ দমনের পাশাপাশি মূলধারার গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সাংবাদিকদের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দুটিই প্রয়োজন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে আরও কিছু সুপারিশ দেওয়া হবে এবং সরকার সেগুলো বিবেচনা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।