
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের একটি বাথরুম থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে শাহবাগ থানা পুলিশ। সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে হাসপাতালের ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি নারী বাথরুমের ৪ নম্বর কক্ষ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
নিহত নারীর বয়স আনুমানিক ২৮ বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আত্মহত্যা করেছেন, নাকি হত্যার পর মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল—তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। তবে মরদেহ উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনে রক্তমাখা একটি কালো স্টিলের ছুরি এবং আশপাশে রক্তের দাগ পাওয়ায় ঘটনাটি ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্র জানায়, সোমবার সকাল ১০টার দিকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদ শেখ নারী বাথরুম পরিষ্কার করতে যান। নিয়ম অনুযায়ী তিনি একে একে কক্ষগুলোর দরজায় নক করে ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের বের হওয়ার অনুরোধ করছিলেন। ৪ নম্বর কক্ষের দরজায় কয়েকবার নক করার পরও কোনো সাড়া না পাওয়ায় তার সন্দেহ হয়।
পরে অন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সহায়তায় দরজা খোলার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে দরজা খুললে ভেতরে ওই নারীকে রক্তাক্ত ও ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। বিষয়টি সঙ্গে সঙ্গে আনসার সদস্য ও হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শাহবাগ থানায় খবর দেয়।
পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাহমুদ শেখ জানান, তিনি দৈনিক ভিত্তিতে ঢামেক হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। সকালে নারী বাথরুম পরিষ্কার করতে গিয়ে একটি কক্ষে কয়েকবার নক করেও কোনো সাড়া পাননি। পরে তিনি রাসেল ও কামাল নামে আরও দুই পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে নিয়ে বিষয়টি দেখতে যান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্ষটির দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। দরজা খোলার পর তারা ওই নারীকে দেখতে পান এবং বিষয়টি আনসার সদস্য ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানান।
এদিকে একই দিন ভোরে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকের কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনে রক্তমাখা একটি কালো স্টিলের ফল কাটার ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাশী পেল্লী সন্তোষ ছুরিটি দেখতে পান।
সন্তোষ জানান, রক্তাক্ত ছুরিটি পড়ে থাকতে দেখে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি ওই এলাকার মেঝে পরিষ্কার করেন। পরে ছুরিটি ধুয়ে নিজের কাছে রেখে দেন। কয়েক ঘণ্টা পর তিনি জানতে পারেন, ১১০ ও ১১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাছাকাছি একটি বাথরুমের কক্ষে এক নারীকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এমন আলোচনা চলছে। তবে ওই নারীর মৃত্যুর ঘটনা তিনি নিজে দেখেননি বলে জানান।
ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. শায়লা ফেরদৌস আহসান বলেন, সকালে হাসপাতালে এসে তিনি এক নারীকে বাথরুমে রক্তাক্ত অবস্থায় ঝুলিয়ে রাখার খবর জানতে পারেন। পরে নিজের কক্ষের পাশে থাকা আনসার সদস্যদের কাছে বিষয়টি জানতে চান এবং তারা আগে কোনো অস্বাভাবিক কিছু দেখেছেন কি না তা জিজ্ঞাসা করেন।
তিনি জানান, প্রশাসনিক ব্লকের কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের বাইরে মেঝেতে রক্তাক্ত একটি ছুরি পড়ে থাকতে দেখা যায়। সকাল ৮টার আগের দিকে আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পরিবর্তনের সময় দায়িত্বে থাকা সদস্য হাসপাতালের অফিস স্টাফ ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী সন্তোষকে ডেকে ওই স্থান পরিষ্কার করতে বলেন।
ডা. শায়লা ফেরদৌসের ভাষ্য, প্রথমদিকে বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত ছিল না। হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় বিভিন্ন সময় মেঝেতে রক্ত পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাই কোনো রোগীর নিজের শরীরে আঘাত কিংবা অন্য কোনো ঘটনার কারণে রক্ত পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে সন্তোষ গ্লো-টেক্স সলিউশন দিয়ে মেঝে পরিষ্কার করেন এবং ছুরিটি নিজের কাছে রাখেন।
তিনি আরও জানান, কনফারেন্স রুমের দ্বিতীয় গেটের সামনেও রক্তের দাগ এবং আশপাশে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলোও পরিষ্কার করা হয়েছে। ওই এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে জানান তিনি।
খবর পেয়ে শাহবাগ থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করেন। ঘটনাস্থলে সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিট ও ডিবি পুলিশের সদস্যরাও কাজ করছেন।
শাহবাগ থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, খবর পাওয়ার পর পুলিশ ঢামেক হাসপাতালে যায়। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। সিআইডির ক্রাইমসিন ইউনিটের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে রয়েছেন। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনাস্থল ও আশপাশ থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে নারীর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জানার চেষ্টা চলছে।