

সারাদিন ডেস্কে বসে কাজ, মোবাইল স্ক্রলিং, ল্যাপটপে দীর্ঘ সময় কাটানো কিংবা রাতে সিনেমা-সিরিজ ও গেমে সময় ব্যয় বর্তমান জীবনের এই অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। চিকিৎসকদের মতে, এই নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন অজান্তেই মস্তিষ্ককে দ্রুত বার্ধক্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকলে শুধু শরীরই নয়, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতাও কমতে শুরু করে। নিয়মিত শারীরিক নড়াচড়া না থাকলে ডোপামিনসহ গুরুত্বপূর্ণ নিউরোকেমিক্যালের উৎপাদন হ্রাস পায় যা মনোযোগ, চিন্তাশক্তি ও মানসিক সক্রিয়তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এর ফলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী অনেক মানুষের মধ্যেই এখন মস্তিষ্কের এই “নীরব বার্ধক্য” দেখা যাচ্ছে যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। শরীর নিষ্ক্রিয় থাকলে স্নায়ুপথের কার্যক্রমও ধীর হয়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে দৈনন্দিন জীবনে মনোযোগ কমে যাওয়া, কাজের গতি হ্রাস পাওয়া এবং দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো সমস্যায়।
এছাড়া কিছু সূক্ষ্ম উপসর্গও দেখা দিতে পারে, যেমন মাথা ঝিমঝিম করা বা ‘ব্রেন ফগ’, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, শরীরে জড়তা এবং প্রতিক্রিয়ার গতি কমে যাওয়া। অনেকেই এগুলোকে সাধারণ ক্লান্তি ভেবে উপেক্ষা করেন যা পরবর্তীতে বড় সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস মস্তিষ্কের গঠনেও পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হিপ্পোক্যাম্পাস অংশের আয়তন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে যা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি পার্কিনসনসের মতো স্নায়ুবিক রোগ এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্রেন ফগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দিনে আট ঘণ্টা বা তার বেশি সময় বসে থাকলে কগনিটিভ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। এমনকি নিয়মিত ব্যায়াম করলেও দীর্ঘ সময় বসে থাকার ক্ষতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়।
তবে আশার কথা হলো, ছোট ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে এই ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। প্রতি ৩০ থেকে ৬০ মিনিট পরপর উঠে হাঁটাহাঁটি করা, নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করা এবং দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক নড়াচড়া বাড়ানো মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।
চিকিৎসকদের মতে, মস্তিষ্ক অত্যন্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি-নির্ভর অঙ্গ। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে রক্তসঞ্চালন কমে গিয়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। তবে নিয়মিত নড়াচড়া করলে মস্তিষ্কে বিডিএনএফ নামক প্রোটিনের মাত্রা বাড়ে যা স্নায়ুকোষকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।