
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই রোগে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে। গত ২৬ বছরের পরিসংখ্যান বিবেচনায় এটি এক বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হিসাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ১ হাজার ৯৯৬ জন নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালিত একটি পর্যালোচনায় গুরুতর কিছু তথ্য উঠে এসেছে।
আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকীর নেতৃত্বে ১১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, মৃতদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মারা গেছেন।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ৩১ দশমিক ২ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে এক্সপানডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে। রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় মারা গেছেন ১৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং অন্যান্য কারণে মৃত্যু হয়েছে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ রোগীর।
অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকী জানান, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শনাক্ত করতেই অন্তত তিন দিন সময় লেগেছে। ফলে রোগ শনাক্ত হওয়ার আগেই অনেকের শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ছে।
চিকিৎসাবিদ অধ্যাপক এ বি এম আব্দুল্লাহর মতে, বারবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়া, রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব এবং রোগটির উপসর্গে পরিবর্তনের কারণে গুরুতর রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।
তিনি জানান, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে। প্রথমবার আক্রান্ত হলে অনেকের ক্ষেত্রে রোগটি সহজে শনাক্ত হয় না। জ্বর, শরীর ব্যথা বা অন্যান্য উপসর্গকে সাধারণ জ্বর-সর্দি হিসেবে বিবেচনা করে অনেকে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না।
তবে পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে রোগের তীব্রতা বেশি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আরও বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গু দ্রুত শনাক্ত করাও আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বর খুব বেশি থাকে না। এক-দুই দিন জ্বর, শরীর ব্যথা, নাক দিয়ে পানি পড়া কিংবা কাশির মতো সাধারণ উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফলে অনেকেই এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দেন না এবং শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যান।
তিনি বলেন, রোগ শনাক্তের সময় অনেকের অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে। তাই ডেঙ্গুর মৌসুমে জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা, সর্দিসহ হালকা উপসর্গ থাকলেও পরীক্ষা করানো উচিত।
ডেঙ্গুর জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান।
তিনি বলেন, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসা নির্ধারণ করা জরুরি। শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা কমে গেলেই প্লেটলেট দিতে হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়।
অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্লেটলেট দেওয়া, ভুলভাবে তরল বা স্যালাইন প্রয়োগ এবং শরীরে অতিরিক্ত তরল প্রবেশ করানোর কারণেও রোগীর বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে জানান তিনি। গুরুতর অবস্থায় এসব জটিলতা মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
ডেঙ্গু পরীক্ষা আরও সহজলভ্য করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক নাজমুল। বিশেষ করে শহর ও গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ যাতে সহজে পরীক্ষা করাতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ২০২৩ সালে। ওই বছর প্রাণ হারান ১ হাজার ৭০৫ জন। ২০২৪ সালে মারা যান ৫৭৫ জন।
আর ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২৮১। চলতি বছর ইতোমধ্যে একই সংখ্যক মৃত্যু হওয়ায় বছরের শেষ দিকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।