
বাংলাদেশ ফাইন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ কানাডায় পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। তার নিজের ও পরিবারের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতায় অন্তত ১৪ ধরনের সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মামলা কিংবা দৃশ্যমান আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
বিএফআইইউর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট লেনদেনে প্রায় ৫৫ লাখ কানাডিয়ান ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ আনুমানিক ৪৫ কোটি টাকা, স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া যায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৩ জুলাই শেখ নূর ইসলাম পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় যান। দেশটির বিমানবন্দরে শিলা ইসলাম ২০ হাজার কানাডিয়ান ডলার এবং দিশা ইসলাম ১০ হাজার কানাডিয়ান ডলার সঙ্গে থাকার ঘোষণা দেন।
তবে বিএফআইইউর তদন্তে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এসব অর্থ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ঘোষণা বা আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট আইনে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তদন্তে কানাডায় ‘শেখ নূর ম্যানেজমেন্ট ইনকর্পোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বের তথ্য পাওয়া যায়। বিএফআইইউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে পরবর্তী চার বছরে সিঙ্গাপুরের নাই এনগোয়ান রেমিটেন্স সার্ভিসের মাধ্যমে পণ্য আমদানির বিল পরিশোধের কথা দেখিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রায় ২২ লাখ কানাডিয়ান ডলার পাঠানো হয়।
বাংলাদেশের রংকন হোম সলিউশনস লিমিটেড থেকে ওই অর্থ পাঠানোর তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে।
তবে বিএফআইইউর আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ওই অর্থের বিপরীতে কানাডা থেকে বাংলাদেশে কোনো পণ্য আমদানির তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে লেনদেনগুলোকে সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করে সংস্থাটি।
এ ছাড়া শেখ নূর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে কানাডায় একাধিক কোম্পানি থাকার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
বিএফআইইউর তদন্তে পাওয়া তথ্য, নথি ও অন্যান্য প্রমাণ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু এরপরও কেন মামলা বা কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে বর্তমান কর্মকর্তাদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অর্থনীতিবিদ শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, কোনো ব্যক্তি অবৈধভাবে বা প্রয়োজনীয় ঘোষণা ছাড়াই বিদেশে অর্থ স্থানান্তর করলে এবং তার পক্ষে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, একটি সরকারের সময়ে কোনো তদন্ত বা মামলার কার্যক্রম শুরু হলে সরকার পরিবর্তনের পরও সেটি আইন অনুযায়ী চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। অর্থপাচারের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে এক প্রতিবাদলিপির মাধ্যমে অর্থপাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শেখ নূর ইসলাম। তার দাবি, সালমান মুক্তাদিরকে বিয়ে করার কারণে মেয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই।
তবে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদন্তে শনাক্ত সম্পদের বাইরে কানাডায় শেখ নূর ইসলাম এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে আরও কয়েকটি বাড়ি থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
অর্থপাচারের অভিযোগে পাওয়া এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পরবর্তী সময়ে কী ধরনের আইনগত পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।