
মিজানুর রহমান
শিক্ষক যদি হন মানুষ গড়ার কারিগর, তবে মা হবেন শান্তিময় এবং সুন্দর পৃথিবীর গড়ার সুদক্ষ কারিগড়। কারণ একজন সচেতন মায়ের পক্ষে একটি সুন্দর ও শান্তিময় পৃথিবীর মূল ভিত্তি স্থাপন সম্ভব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষক তার ছাত্র বা ছাত্রীকে একটি নির্দিষ্ট বয়স ও সময়ব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক শিক্ষা দিয়ে থাকেন। কিন্তু একজন সন্তানের আসল শিক্ষালয় শুরু হয় মায়ের কোল থেকে। মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থা থেকেই মূলত শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ শুরু হয়। সন্তানের শয়ন, স্বপন, জাগরণ—সবকিছুই প্রভাবিত হয় মায়ের আদর্শ দ্বারা। একজন মানুষের জীবনে শিক্ষকদের সান্নিধ্য বলতে গেলে সীমিত সময়ের জন্য, কিন্তু মায়ের ছায়ায় কাটে তার জীবনের দীর্ঘ কাল। যে কারণে, মায়ের প্রতিটি আচরণ, কথা ও মানসিকতা সন্তানের অবচেতন মনে স্থায়ীভাবে রেখাপাত করে।
শিশুর জন্মের পর থেকে তার মায়ের কাছ থেকে সে ভাষা ও সামাজিক রীতিনীতি শিখতে শুরু করে। সে তার মাকে সবসময় অনুসরণ ও অনুকরণ করে। মা যদি সন্তানকে পরোপকার, সততা, সহমর্মিতা, ক্ষমা এবং ধৈর্যের পাঠ দিতে সক্ষম হন, তবে সেই সন্তান বড় হয়ে অবশ্যই সমাজকে আলোড়িত এবং আলোকিত করে। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী থমাস আলভা এডিসন একবার বলেছিলেন, “আমার মা-ই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তিনি আমার প্রতি এতটাই বিশ্বাসী ছিলেন যে আমার মনে হয়েছিল, আমার বেঁচে থাকার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে এবং আমাকে কোনোভাবেই তাকে হতাশ করা যাবে না।”
মায়ের দেওয়া মানবিক মূল্যবোধের গভীরতা বা ব্যাপ্তি যত বেশি হয়, সন্তানের মানসিক সংস্করণটিও ঠিক তত বেশি সমৃদ্ধ ও সুদৃঢ় হয়। একজন মা তার সন্তানকে যতখানি মানবতার দীক্ষা দেবেন, তার সন্তান ভবিষ্যতে পৃথিবীতে ঠিক ততটুকু মানবিকতার প্রতিফলন ঘটাবে।
পণ্যের গুণগত মান যেমন তার কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, ঠিক তেমনি একটি সুন্দর সমাজ বা আগামী পৃথিবী কেমন হবে, সেটা আজকের মায়েদের দেওয়া শিক্ষা-দীক্ষার ওপর নির্ভশীল। আজকের শিশুই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। মা যদি তার সন্তানকে শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও সৌহার্দ্যের শিক্ষা দেন, তবে সেই সন্তান কখনো পৃথিবীকে অশান্ত করতে পারে না। তাই আগামী সমাজ ও পৃথিবীর রূপরেখা মায়েদের দেয়া শিক্ষা ও দীক্ষার ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল।
একজন শিক্ষিত ও সচেতন মা কেবল একটি সন্তানকে নয়, বরং পুরো একটি প্রজন্মকে আলোর পথে চলতে শেখাতে পারেন। মায়ের হাত ধরেই পৃথিবীতে জন্ম নেয় একেকজন মহামানব, যারা বদলে দিয়েছেন পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস।
পরিশেষে বলা যায়, মা হলেন সুন্দর ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ার এক অনন্য ও সুনিপুণ কারিগর। তিনি কেবল একজন ব্যক্তি মানুষকে গড়েন না, বরং একটি শান্তিময় বিশ্ব গড়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আসুন, আমরা আমাদের মায়েদের এই চিরন্তন ত্যাগ ও অবদানকে শ্রদ্ধা জানাই। মায়েদের দেওয়া নৈতিকতা এবং মানবতার শিক্ষা ও দীক্ষাকে বুকে ধারণ করে একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন ও শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তুলতে নিজের জায়গা থেকে আমরা প্রত্যেকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।
লেখক: সাংবাদিক ও মোটিভেটর