
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে দেওয়া কারাদণ্ডের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে প্রসিকিউশন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ৩০ বছরের কারাদণ্ডের পরিবর্তে ইনুর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করা হয়েছে।
এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তিনটি অভিযোগে হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার সময় আদালতের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে উসকানি, নির্দেশনা, সহায়তা এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার অভিযোগ আনা হয়। অভিযোগের মধ্যে কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে উল্লেখ করেন। আন্দোলন দমনে তার বক্তব্য উসকানিমূলক ভূমিকা রেখেছিল বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এরপর ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে ইনুও উপস্থিত ছিলেন। প্রসিকিউশনের দাবি, ওই বৈঠকে আন্দোলন দমনে কঠোর পদক্ষেপ, সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং ইনু এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০ জুলাই ইনু কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওই সময়ের পর কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও দমন-পীড়নের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনের বিষয়ে ইনু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও, হেলিকপ্টার থেকে হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।
২০ জুলাইয়ের ঘটনায় শেখ হাসিনার নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ইনু সমর্থন ও সহযোগিতা করেছেন বলেও প্রসিকিউশনের অভিযোগ।
২৭ জুলাই একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইনু আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে অন্যদিকে পরিচালিত করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে কারফিউ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের প্রতি তিনি পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
২৯ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকেও ইনুর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগে। সেখানে আন্দোলন দমনের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ বাস্তবায়নে তার নির্দেশনা ও সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে কারফিউ বহাল রাখা, গুলি চালানো এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইনু ভূমিকা রাখেন। এ বিষয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়েছেন বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও আন্দোলন দমনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। হাসপাতাল মোড় থেকে চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় বিভিন্ন স্থানে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ।
প্রসিকিউশনের দাবি, তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের কয়েকজন নেতার নির্দেশ এবং পুলিশের উপস্থিতি ও সহযোগিতায় স্থানীয় সশস্ত্র নেতাকর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই দিন দুপুর থেকে বিকেলের মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তাদের মধ্যে বক চত্বরের কাছে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুর সড়কে আড়ংয়ের সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও মো. উসামা, তুলাপট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীতে ইউসুফ শেখ নিহত হন।
প্রসিকিউশনের অভিযোগের ভিত্তিতেই ট্রাইব্যুনাল ইনুকে তিনটি অভিযোগে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এখন ওই সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আবেদন জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।