শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর নিত্যপণ্যের বাজারে নতুন চাপ জ্বর-কাশির রোগীতে ভিড়, ডেঙ্গু-হামের চাপে শয্যাসংকট বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী : মাহদী আমিন প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়াবে : রাষ্ট্রপতি আসছে টানা ৭ দিন ছুটির সুযোগ ফিলিস্তিনিদের পাশে বাংলাদেশের থাকার বার্তা জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর শিশুর আঙুল বিচ্ছিন্নের অভিযোগে কনস্টেবল ও স্ত্রী গ্রেপ্তার লেবুর দানা গিলে ফেললে দুশ্চিন্তার কারণ আছে কি? নিউইয়র্কে তারেক রহমান-শাহবাজ শরিফের প্রথম বৈঠক, বাণিজ্য-যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা জিৎ-ইধিকার জুটি নিয়ে টালিপাড়ায় নতুন আলোচনা মিরপুর-তেজগাঁওয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ডিএনসিসির অভিযান, মাঠে সক্রিয় আনসার ব্যাটালিয়ন সপ্তাহের আমল পর্যালোচনায় জুমার দিনের গুরুত্ব নরসিংদীতে অটোরিকশা-কাভার্ডভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২ ‘আট মাস ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি’, প্রাথমিক নিয়োগ নিয়ে নাহিদের অভিযোগ প্রকৃতির অপরূপ সাজে মিরিঞ্জা ভ্যালি, ভ্রমণপিপাসুদের নতুন ঠিকানা গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে : পেট্রোবাংলা সরকারের ভেতরের একটি অংশ আওয়ামী লীগকে ফেরাতে ইন্ধন দিচ্ছে : পরওয়ার প্রতিটি মানুষ চরিত্র, পরিবার এবং মানবিক মূল্যবোধের দর্পণ স্বরূপ-মিজানুর রহমান শিশুর কৌতূহল ও ইতিবাচক অভিভাবকত্ব সুদহার ও মধ্যপ্রাচ্যের টানাপোড়েনে দোদুল্যমান স্বর্ণবাজার
Notice :

সপ্তাহের আমল পর্যালোচনায় জুমার দিনের গুরুত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক
ছবি: সংগৃহীত

সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় জুমার দিনের গুরুত্ব মুসলমানদের কাছে আলাদা। নামাজ, খুতবা, দোয়া ও ইবাদতের পাশাপাশি দিনটি নিজের জীবন ও আমলের দিকে ফিরে তাকানোর একটি সুযোগ হিসেবেও কাজে লাগানো যায়। ইসলামের পরিভাষায় নিজের কাজ, নিয়ত, আচরণ ও ইবাদতের হিসাব নিজেই নেওয়ার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘মুহাসাবাতুন নাফস’ বা আত্মপর্যালোচনা।

দুনিয়াবি জীবনে একজন মানুষ যেমন নিয়মিত নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব করেন, তেমনি একজন মুমিনের জন্য নিজের আমল ও আচরণের হিসাব নেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পার্থিব কোনো ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে পরে পূরণ করা সম্ভব হলেও আখেরাতের ক্ষতির বিষয়টি ভিন্ন। তাই নিয়মিত আত্মসমালোচনা, ভুল চিহ্নিত করা এবং সংশোধনের চেষ্টা আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের নিজেদের কর্মের দিকে তাকানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সুরা আল-হাশরের ১৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—

‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর; আর প্রত্যেকের উচিত চিন্তা করে দেখা সে আগামীকালের জন্য কী প্রেরণ করেছে’।

এই আয়াতের আলোকে তাফসিরকারদের আলোচনায় নিজের আমল ও কাজ পর্যালোচনা করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ মানুষকে শুধু কাজ করলেই হবে না, সেই কাজের উদ্দেশ্য, পদ্ধতি ও পরিণতি নিয়েও সচেতন থাকতে হবে।

হাদিসেও নিজের নফসের হিসাবের গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) আত্মপর্যালোচনার গুরুত্ব বোঝাতে বলেছেন—

‘বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করে। আর দুর্বল সেই ব্যক্তি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে নানা আশা পোষণ করে’।

হাদিসটি তিরমিজিতে বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এটিকে হাসান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগের মনীষীরাও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে আত্মপর্যালোচনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর নামে বর্ণিত একটি বক্তব্যে মানুষকে নিজের হিসাব নিজেই নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে—অন্যথায় পরকালে হিসাবের সময় বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিনে গত কয়েক দিনের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করার অভ্যাস তৈরি করা সহজ। জুমার দিন এ ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক সময়সীমা তৈরি করতে পারে। আগের সাত দিনের ইবাদত, ভালো কাজ, ভুলত্রুটি, মানুষের সঙ্গে আচরণ এবং সময় ব্যবহারের বিষয়গুলো একসঙ্গে পর্যালোচনা করা যায়।

জুমার নামাজ ও খুতবার আবহ মানুষকে ইবাদত ও আত্মিক চিন্তার দিকে মনোযোগী করে। এ সময় নিজের ভুল স্বীকার করা, তওবা করা এবং ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার সংকল্প নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া জুমার দিনের দোয়া কবুলের বিশেষ সময় সম্পর্কে হাদিসে আলোচনা রয়েছে। বিশেষ করে আসর থেকে মাগরিবের মধ্যবর্তী সময়কে অনেকে এ উদ্দেশ্যে কাজে লাগান। এ সময় তওবা, দোয়া ও ভালো কাজের সংকল্প করা যেতে পারে।

আত্মপর্যালোচনার জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। জুমার নামাজের পর কিংবা সুবিধাজনক কোনো সময়ে মাত্র ১৫ মিনিট নিরিবিলি পরিবেশে বসে নিজের গত সপ্তাহের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

প্রথম পাঁচ মিনিটে গত সপ্তাহের ভালো কাজ, ইবাদত এবং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলো স্মরণ করা যেতে পারে। এতে কৃতজ্ঞতার অনুভূতি তৈরি হয়।

পরের পাঁচ মিনিটে নিজের ভুল ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা যেতে পারে। যেমন—নামাজে অবহেলা হয়েছে কি না, কারও মনে কষ্ট দেওয়া হয়েছে কি না, মিথ্যা বলা, গিবত, রাগ, অহংকার বা অন্য কোনো অনুচিত আচরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় নিয়ে নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে।

পরবর্তী তিন মিনিট তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার জন্য রাখা যেতে পারে। আর শেষ দুই মিনিটে আগামী সপ্তাহের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভালো কাজের পরিকল্পনা করা যেতে পারে।

আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে একসঙ্গে সব ধরনের বদভ্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা অনেক সময় বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। তাই নিজের সবচেয়ে বড় একটি দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেটি নিয়ন্ত্রণের সংকল্প নেওয়া যেতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে কেউ যদি বুঝতে পারেন যে তিনি নিয়মিত গিবত করেন, তাহলে পরবর্তী সাত দিন গিবত থেকে নিজেকে বিরত রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন। অন্য কেউ যদি অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করেন, তাহলে স্ক্রিন টাইম কমানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করতে পারেন।

এভাবে ছোট ছোট পরিবর্তন নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হলে আত্মশুদ্ধির পথও ধীরে ধীরে সহজ হতে পারে।

সাপ্তাহিক আত্মপর্যালোচনার সময় কয়েকটি সহজ প্রশ্ন নিজের কাছে রাখা যেতে পারে—গত সপ্তাহে আমি ফরজ ইবাদতগুলো ঠিকভাবে পালন করেছি কি না, কারও অধিকার নষ্ট করেছি কি না, কাউকে কথায় বা আচরণে কষ্ট দিয়েছি কি না, মিথ্যা বা গিবতে জড়িয়েছি কি না, বাবা-মা ও আত্মীয়দের প্রতি দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছি কি না।

এর পাশাপাশি সময় কোথায় ব্যয় হয়েছে, কোন কাজগুলো উপকারী ছিল এবং কোন অভ্যাসগুলো সময় নষ্ট করেছে—সেটিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

মুহাসাবাহর মূল উদ্দেশ্য নিজেকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়; বরং ভুল বুঝে তা সংশোধনের পথ তৈরি করা। একজন মানুষ যখন নিয়মিত নিজের কাজ পর্যালোচনা করেন, তখন তার মধ্যে নিজের আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়তে পারে। ভুলের পর তওবা করা এবং একই ভুল পুনরায় না করার চেষ্টা আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়।

ইসলামি জ্ঞানচর্চার ধারায় ইমাম গাজ্জালি (রহ.)-সহ বহু আলেম আত্মপর্যালোচনাকে আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন হিসেবে আলোচনা করেছেন। তাদের লেখায় নিজের কাজ, নিয়ত ও নফসের প্রবণতা সম্পর্কে সচেতন থাকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

মানুষের জীবনে বাহ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি অন্তরের অবস্থার দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত মুহাসাবাহ একজন মানুষকে নিজের দুর্বলতা চিনতে, ভুলের জন্য অনুতপ্ত হতে এবং সংশোধনের উদ্যোগ নিতে সহায়তা করতে পারে।

তাই জুমার দিনকে শুধু সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন হিসেবে নয়, নিজের জীবন ও আমল পর্যালোচনার একটি সুযোগ হিসেবেও নেওয়া যেতে পারে। গত সপ্তাহের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী সপ্তাহে আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা—এই ধারাবাহিকতাই আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার একটি বাস্তব অনুশীলন হতে পারে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের নিজেদের ভুল ও দুর্বলতা উপলব্ধি করার, আন্তরিকভাবে তওবা করার এবং নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে সুন্দর করার তৌফিক দান করুন। আমিন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *