মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৯ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম এখনও তুলনামূলক কম: রিজভী ইমরান খানের তিন বোনই আটক, পিটিআইয়ের নিন্দা জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় ছাড়া সরকারের সামনে বিকল্প ছিল না: প্রতিমন্ত্রী আফগানিস্তানে রাতভর পাকিস্তানের হামলা, নিহত একই পরিবারের ৩ জন অপ্রতিম হত্যা : তথ্য গোপন করায় সিয়ামকে গ্রেপ্তার দেখাল পুলিশ এমপি নজরুলের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধামরাইয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে মহিলাদল নেত্রীর মামলা ব্যাংক পরিচালনায় নিজেদের সংস্কারে এনসিসি ও এসবিএসি মন্ত্রিসভায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অধ্যাদেশের সংশোধনী অনুমোদন অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য, সরাসরি জড়িত তিনজন : পুলিশ হাইকোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, রাজধানীতে একের পর এক বিস্ফোরণের ঘটনা ইনুর মামলার ৫০০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ, ৩ অভিযোগ প্রমাণিত ধামরাইয়ে ব্যাটারি কারখানায় রাতে চীনা কর্মকর্তাকে বেঁধে ৭০ লাখ টাকা লুটের অভিযোগ পুত্রসন্তানের মা হলেন অভিনেত্রী সোহিনী সরকার দেশের হাসপাতালেই উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিতের তাগিদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর রাশিয়ায় ড্রোন হামলায় নিহত ২, ক্ষতিগ্রস্ত তেল শোধনাগার ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন তারেক রহমান অপ্রতিম হত্যায় গ্রেফতার ৪, অপরাধ স্বীকারের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অপ্রতিমের শেষ বিদায়, বাবার কণ্ঠে ন্যায়বিচারের দাবি
Notice :

মথুরাপুর দেউল : ইতিহাস, শিল্প ও অবহেলার এক অনন্য সাক্ষ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত মথুরাপুর দেউল বা মঠ অঞ্চলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য নিদর্শন। ১২ কোণ বিশিষ্ট এই দেউলটির উচ্চতা প্রায় ২১.২ মিটার যা এর প্রাচীন নির্মাণশৈলী ও স্থাপত্যকুশলতার পরিচয় বহন করে।

ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে মধুখালী উপজেলায় অবস্থিত মথুরাপুর দেউল বা মঠ বাংলাদেশের মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের এক বিরল নিদর্শন। ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের মধুখালী বাজার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে মধুখালী–বালিয়াকান্দি আঞ্চলিক সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনাটি সময়ের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে। এর ঠিক বিপরীতে শান্তভাবে বয়ে চলেছে চন্দনা নদী যা দেউলটির সৌন্দর্যে যোগ করেছে এক অনন্য নান্দনিকতা।

এই বিজয়স্তম্ভটি মুঘল সেনাপতি মানসিংহ নির্মাণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। যদিও এর ঐতিহাসিক প্রমাণ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে তবুও এটি স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

আনুমানিক ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত এই দেউলটি প্রায় ৪০ শতাংশ জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এবং এর উচ্চতা প্রায় ৮০ ফুট। প্রাচীন ইট, চুন ও সুরকির মিশ্রণে নির্মিত এই স্থাপনার গায়ে খচিত টেরাকোটার সূক্ষ্ম অলংকরণ আজও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।

দেয়ালজুড়ে দেখা যায় হিন্দু পুরাণের রামায়ণ ও কৃষ্ণলীলার দৃশ্য, পাশাপাশি গায়ক, নৃত্যশিল্পী, হনুমানের প্রতিচ্ছবি ও যুদ্ধদৃশ্যের নিখুঁত চিত্রায়ণ। প্রতিটি কোণের মাঝখানে স্থাপিত মুখাবয়বগুলো সেই সময়ের শিল্পচেতনার অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।

স্থাপনাটির বাইরের দেয়াল লম্বালম্বিভাবে সজ্জিত যা এর নান্দনিক সৌন্দর্যকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। পুরো স্থাপনার গায়ে ছড়িয়ে আছে টেরাকোটার জ্যামিতিক নকশা, যা সেই সময়ের কারিগরদের সূক্ষ্ম শিল্পবোধের পরিচয় দেয়।

এছাড়া দেউলের বিভিন্ন অংশে পোড়ামাটির ফলক ও নানা ধরনের মূর্তি খোদাই করা রয়েছে, যা স্থাপনাটিকে শিল্পসমৃদ্ধ এক ঐতিহাসিক নিদর্শনে পরিণত করেছে।

দেউলটির কাঠামো বারো কোণা বিশিষ্ট এবং এর একমাত্র প্রবেশপথটি দক্ষিণমুখী। বাংলার স্থাপত্যধারায় এই ধরনের রেখা প্রকৃতির দেউল অত্যন্ত বিরল বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের কাছে এটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। তবে দুঃখজনকভাবে পর্যটকদের জন্য এখানে নেই কোনো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা। যার ফলে অনেকেই নানা ভোগান্তির মুখোমুখি হন। স্থানীয়দের মতে, পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও সংরক্ষণ উদ্যোগ না থাকায় এই মূল্যবান ঐতিহ্যটি অনেকাংশে অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।

দেউলটি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিভিন্ন মত প্রচলিত রয়েছে। এক সূত্র অনুযায়ী, সংগ্রাম সিং নামের এক সেনাপতি এটি নির্মাণ করেন। ১৬৩৬ সালে ভূষণার জমিদার সত্রাজিতের মৃত্যুর পর তিনি রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পান।

পরবর্তীতে তিনি মথুরাপুরে বসবাস শুরু করেন এবং স্থানীয় এক বৈদ্য পরিবারের কন্যাকে বিবাহ করেন। ধারণা করা হয় তার উদ্যোগেই এই দেউলটির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।

স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, এটি মুঘল সেনাপতি মানসিংহের বিজয়স্তম্ভ হিসেবে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয় যদিও এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

বর্তমানে মথুরাপুর দেউল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এবং সরকারের তত্ত্বাবধানে একটি সুরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে। ফলে এটি শুধু ইতিহাসের অংশ নয় বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও।

সব মিলিয়ে মথুরাপুর দেউল শুধু একটি স্থাপত্য নিদর্শন নয়; এটি বাংলার ইতিহাস, শিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন না হলে এই ঐতিহ্য ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *