
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণভাবে মিয়ানমারে ফেরাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় ১২.৫ লাখ রোহিঙ্গাসহ মোট ১৫ লাখের বেশি মানুষকে সহায়তার আওতায় রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক থেকে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইরিন খান বলেন, রোহিঙ্গাদের সহায়তা, বাংলাদেশকে সহযোগিতা এবং সংকটের স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের মনোযোগও অন্যদিকে সরে যাচ্ছে। ফলে শরণার্থীদের প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জাতিসংঘও জানিয়েছে, ২০২৬ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১০ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন হলেও এটি ২০২৫ সালের তুলনায় কম অর্থায়নের আহ্বান।
আইরিন খান বলেন, রোহিঙ্গারা প্রায় নয় বছর ধরে শিবিরে বসবাস করছে। সেখানে শিশুরা বেড়ে উঠছে এবং প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নিচ্ছে।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তারা যাবে কোথায়? একটি শিবিরে নয় বছর থাকা অনেক দীর্ঘ সময়।’
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে একই ধরনের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের বাস্তুচ্যুতির পর জন্ম নেওয়া একটি প্রজন্মের শৈশবই শিবিরে কেটে যাচ্ছে।
আইরিন খান বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে নিহিত। রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চায়, তবে তারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে চায়।
এ জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য দেশ এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে—এমন দেশগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তার মতে, মিয়ানমার সরকারকে তাদের দায়িত্ব ও আইনগত বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের ভেতরে এমন পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ফিরে যেতে পারে।
জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থাও ২৪ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত অস্থিতিশীল ও বিপজ্জনক। চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান
বড় ধরনের সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে আইরিন খান বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর আরও কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাশীল এবং কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে বিশ্বাস করে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংকট সমাধানে পাঁচটি প্রস্তাব দেন।
প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ প্রণয়ন; বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা; বিচার ও জবাবদিহি জোরদার করা এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটে শুধু বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা নয়, এখন এর স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।