

দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটকে ঘিরে অর্থনীতিতে একদিকে যেমন বড় ধরনের বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে রাজস্ব আহরণ ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে গুরুতর প্রশ্ন।
২০২৬–২৭ অর্থবছরের এই বাজেটে সরকার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য অর্জন কতটা বাস্তবসম্মত—তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও খাদ্য নিরাপত্তা খাতেও বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার রোডম্যাপও বাজেটে যুক্ত করা হয়েছে, যা উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই বড় বাজেটের বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে রাজস্ব আহরণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে যা বিশ্লেষকদের মতে অত্যন্ত কঠিন। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়াবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের আকার জিডিপির তুলনায় বড় হলেও দেশের বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার মতো বিশাল ব্যয় ভবিষ্যতে বাজেটের ওপর চাপ বাড়াবে।
অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা অর্থনীতিতে গতি আনার ইঙ্গিত দিলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা এই উদ্যোগের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রাক্কলিত বাজেট উপস্থাপন করা হয়। এতে বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কল্যাণমূলক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৪ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
প্রতিবছর বাজেট থেকে সুদ পরিশোধ বাবদ যে অর্থ ব্যয় হয় তার বড় অংশই যায় স্থানীয় ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে বাজেটের আকার হওয়া উচিত জিডিপির অন্ততপক্ষে ২৫ শতাংশ। সেই বিবেচনায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বেশি নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে এই টাকা আমাদের পক্ষে এই মুহূর্তে রাজস্ব হিসাবে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এই টাকা ব্যয় করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈদেশিক এবং অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ঋণ গ্রহণ করতে হবে। ভ্যালু ফর মানি নিশ্চিত করে এই টাকা ব্যয় করার সক্ষমতা আমাদের নেই। মাহবুব আহমেদ বলেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার স্বার্থে এ বছরের বাজেটের আকার সীমিত রাখাই যুক্তিসঙ্গত হবে।
জানা গেছে, আগামী বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বরাদ্দ বর্তমান সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। আগামী বাজেটে জিডিপি’র ৩১.৪ শতাংশ (বেসরকারি ২৪.৯ শতাংশ ও সরকারি ৬.৫ শতাংশ) বিনিয়োগ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ভর্তুকি কমানোর শর্তের মধ্যেও আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকিকে বিবেচনায় নিয়ে সরকার ভর্তুকি খাতের প্রকৃত চাহিদা এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ বাবদ ১ লাখ ১৬ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় কিছুটা বেশি। গত অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪৫৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ ভর্তুকি ব্যয় আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরছে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, এলএনজি আমদানিতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সারে ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্য সহায়তায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও সার খাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করলেও এর ফলে সরকারি ব্যয় কাঠামোতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একদিকে আইএমএফ ভর্তুকি কমানোর ওপর জোর দিচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সরকারকে বরাদ্দ বাড়াতে বাধ্য করছে এই দ্বৈত চাপ নীতিনির্ধারণকে জটিল করে তুলছে। ফলে ভর্তুকি সংস্কার না করে বরং তা নির্ভরশীল খাতে সম্প্রসারণ করা হলে বাজেট ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সব মিলিয়ে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ও বড় বাজেটের মাধ্যমে সরকার যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বার্তা দিচ্ছে তেমনি বাস্তবায়ন, রাজস্ব সক্ষমতা এবং বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।