
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির কারণে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। একই সঙ্গে দেশে এলপিজির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে কেউ গ্যাস মজুদ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতা, ভবিষ্যতে নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনা, এলপিজির আমদানি ও মজুদ পরিস্থিতি এবং বাজারে দাম বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক ব্যবহারসংক্রান্ত নতুন চুক্তির প্রভাব রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পড়বে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, এই চুক্তির কারণে রূপপুর প্রকল্পে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি জানান, বাংলাদেশ মাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করেছে। ফলে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চাহিদা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বিবেচনা করে পারমাণবিক বিদ্যুতের বিভিন্ন বিকল্প খোলা রাখা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে কি না, সেই সম্ভাবনা এখনই বাতিল করে দেওয়ার সুযোগ নেই। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতের জন্য বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না। এর সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ, প্রকৌশলী ও কারিগরি জনবলের প্রশিক্ষণসহ আরও অনেক বিষয় জড়িত। এসব ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি ও সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রাখা হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার বিরোধ ও নানা সংকট থাকলেও বাংলাদেশ রাশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এমনকি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
তিনি আরও বলেন, চীন, ভারত, রাশিয়া ও তুরস্কসহ যেসব দেশের সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বজায় থাকবে। দেশের স্বার্থে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করাকে কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার কারণ নেই।
দেশের বাজারে এলপিজির কোনো সংকট নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি বলেন, আমদানি, মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি রয়েছে।
এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটররাও দেশে গ্যাসের সংকট নেই বলে সরকারকে জানিয়েছেন। ফলে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কোথাও দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দিলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
এলপিজির আমদানি পরিস্থিতি তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান জানান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখ পর্যন্ত দেশে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি।
আমদানি ও মজুদের এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে এলপিজির পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তাই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো যৌক্তিকতা নেই।
দেশে পর্যাপ্ত এলপিজি মজুদ থাকার পরও কোথাও কোথাও দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, অসাধু উদ্দেশ্যে কেউ যেন এলপিজি মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও মজুদ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা করা হলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রবণতার কথাও উল্লেখ করেন জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে কিছু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার আশায় এলপিজি মজুদ করার চেষ্টা করতে পারেন।
তবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মজুদদারি করা হলে সরকার তা মেনে নেবে না। বাজারে স্বাভাবিক সরবরাহ বজায় রাখা এবং ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এর আগে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে এলপিজি খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় এলপিজির আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও বাজারদরসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। এতে এলপিজি আমদানিকারক ও অপারেটরদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় আমদানিকারক ও অপারেটরদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশে এলপিজির সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতি সন্তোষজনক। বর্তমানে বাজারে কোনো সংকট নেই বলেও তারা মন্ত্রণালয়কে আশ্বস্ত করেন।
একদিকে ভবিষ্যতের জ্বালানি চাহিদা পূরণে পারমাণবিক বিদ্যুতের সম্ভাবনা ধরে রাখা, অন্যদিকে এলপিজির স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকারের আলোচনায় উঠে এসেছে।
জাহেদ উর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি দেশের বাজারে এলপিজির সরবরাহ ও মজুদ পরিস্থিতিও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর প্রবণতা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।