

জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সদস্যপদ নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া এখনো নির্বাচন কমিশনে পৌঁছায়নি। দল থেকে বহিষ্কারের পর প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও জাতীয় সংসদের স্পিকার দপ্তর থেকে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে কোনো আনুষ্ঠানিক রেফারেন্স বা চিঠি পাঠানো হয়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এখনো পায়নি ইসি।
জামায়াতে ইসলামী গত ২৩ জুলাই গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানিয়ে স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি দেয়। দলটির ভাষ্য, সাংগঠনিক তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ২১ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি জানানো হলেও স্পিকারের কাছ থেকে এখনো কোনো চিঠি পাওয়া যায়নি। সংসদ সচিবালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি পাঠানো হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসি জানিয়েছে, দলীয়ভাবে পাঠানো চিঠির ভিত্তিতে কমিশনের সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সংসদ সচিবালয় থেকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় বিষয়টি কমিশনের কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে।
‘দ্য মেম্বার্স অব পার্লামেন্ট (ডিটারমিনেশন অব ডিসপিউট) অ্যাক্ট, ১৯৮০’-এর ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্যের পদ বা আসন নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে স্পিকারকে ৩০ দিনের মধ্যে বিরোধ-সংক্রান্ত তথ্য প্রস্তুত করে তা নির্বাচন কমিশনে পাঠাতে হবে।
আইনের এই বিধানের আলোকে গাজী নজরুলের বিষয়টি কেন এখনো ইসিতে পাঠানো হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এখানে মূল আইনি প্রশ্ন হচ্ছে জামায়াতের বহিষ্কারের চিঠি পাওয়ার পর থেকেই বিষয়টিকে আইনের অর্থে ‘বিরোধ’ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না।
সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সংসদ সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেছেন, আইনে বিরোধ তৈরি হলে ইসিতে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে; গাজী নজরুলের ক্ষেত্রে আদৌ সেই ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই বিবেচনার বিষয়।
গাজী নজরুলের সদস্যপদ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধানের ৬৬ ও ৭০ অনুচ্ছেদ।
সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর অযোগ্যতা বা ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্নে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর বিধান রয়েছে। এ ধরনের বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
অন্যদিকে, ৭০ অনুচ্ছেদে দলীয় প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর আসন শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো সংসদ সদস্যকে তাঁর রাজনৈতিক দল বহিষ্কার করলে তাঁর সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হবে কি না এ বিষয়ে সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে ইসি ও আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
ইসি ও সংসদ সচিবালয়ের আইনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত কোনো সংসদ সদস্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যে পরিণত হওয়ার সুযোগ পান না। ২০০৮ সালের পর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সংশোধনের ফলে দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলাম এর আগে দল থেকে বহিষ্কারের পরও নিজেকে সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকার দাবি করেছিলেন।
জামায়াতে ইসলামী বলেছে, গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের পর তাঁর সংসদ সদস্যপদ নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দলটি স্পিকার ও ইসিকে লিখিতভাবে জানিয়েছে।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান অভিযোগ করেছেন, প্রয়োজনীয় চিঠি দেওয়ার পরও সংসদ সচিবালয় থেকে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে না। তবে এটি তাঁর রাজনৈতিক দলের বক্তব্য; সংসদ সচিবালয় এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
এর আগে দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্যের সদস্যপদ নিয়ে আইনি জটিলতার নজির রয়েছে। দশম সংসদে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত টাঙ্গাইলের সংসদ সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সদস্যপদ নিয়ে বিষয়টি তৎকালীন নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হয়েছিল।
ইসি এ নিয়ে শুনানিও করেছিল। তবে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগেই লতিফ সিদ্দিকী সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, এ বিষয়ে ইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের নজির সেখানে তৈরি হয়নি।
বর্তমানে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ নিয়ে সিদ্ধান্তের প্রাথমিক ধাপটি সংসদ সচিবালয়ের আনুষ্ঠানিক রেফারেন্সের ওপর নির্ভর করছে। ইসি বলছে, স্পিকারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় চিঠি পেলে আইন অনুযায়ী বিষয়টি পরীক্ষা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ফলে গাজী নজরুলের সদস্যপদ বহাল থাকবে কি না, নাকি আসনটি শূন্য হবে—এ বিষয়ে এখনো নির্বাচন কমিশনের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি ইসিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পৌঁছানোর পর শুনানি ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি হওয়ার কথা।