

রাজধানীর খিলক্ষেতে স্ত্রীকে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে সোহেল শিকদার (৩১) নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। নির্যাতনের সেই ঘটনার ভিডিও ভাইয়ের মোবাইল ফোনে পাঠানোর তিন দিন পর ওই নারীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত মুক্তা ইসলাম মাওয়া (২৫) খিলক্ষেতের একটি ফ্ল্যাটে স্বামী সোহেল শিকদারের সঙ্গে বসবাস করতেন। তাদের দুই সন্তান রয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে যৌতুক ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহে মুক্তাকে নির্যাতন করতেন তার স্বামী।
পরিবারের দাবি, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিবার ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে মুক্তাকে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে তাঁকে খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয় বলে অভিযোগ।
এ সময় সোহেল তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করেন এবং পুরো ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন বলে পরিবারের অভিযোগ। পরে সেই ভিডিও মুক্তার ভাইয়ের মোবাইল ফোনে পাঠিয়ে সোহেল লিখেছিলেন ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও’।
প্রায় তিন মিনিটের ওই ভিডিওতে মুক্তাকে নির্যাতনের দৃশ্য দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিওতে তাকে নিজের নির্দোষতার কথা বলতে এবং আর মারধর না করার জন্য অনুরোধ করতে শোনা যায়।
একপর্যায়ে সন্তানদের কান্নার কথা উল্লেখ করে মুক্তা তার স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি’। কিন্তু পরিবারের দাবি, এরপরও তার ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, নির্যাতনের ঘটনার পর গত বৃহস্পতিবার মুক্তাকে উদ্ধারের জন্য স্বজনরা খিলক্ষেতের বাসায় যান। সেখানে তাঁকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
পরিবারের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই মরদেহ ফ্যান থেকে নামিয়ে ফেলা হয়েছিল। তাঁদের দাবি, নির্যাতনের পর মুক্তাকে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পর্যন্ত অপেক্ষা করছে পুলিশ।
মুক্তার ছোট ভাই তানভীর রহমানের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহে মুক্তার ওপর নিয়মিত নির্যাতন চালানো হতো।
তানভীরের অভিযোগ, কয়েক মাস আগে তাঁর কাছে তিন লাখ টাকা দাবি করেছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় তাঁর বোনকে মারধর করা হতো।
এজাহারে আরও বলা হয়, গত ৩০ আগস্ট মুক্তাকে বেল্ট দিয়ে মারধর করে গুরুতরভাবে আহত করা হয়। ওই নির্যাতনের ভিডিওও সোহেল এক স্বজনের কাছে পাঠিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মুক্তার মৃত্যুর পর তার দুই শিশু সন্তান সাফওয়ান (৫) ও তাসফিয়া (৪) মাকে হারিয়ে সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।
তানভীর রহমান বলেন, তাদের বোন দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হলেও পরিবারের কথা চিন্তা করে অনেক বিষয় গোপন রাখতেন। বাবাকে ছোটবেলায় হারানোর পর তাদের মা অনেক কষ্ট করে চার ভাই-বোনকে বড় করেছেন। বোনের সংসার টিকিয়ে রাখার কথা চিন্তা করে তিনিও অনেক নির্যাতন সহ্য করেছেন বলে পরিবারের দাবি।
মুক্তার স্বজনরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায়। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাঁরা রাজধানীর খিলক্ষেতে বসবাস করতেন।
সোহেল প্রথমে খিলক্ষেত এলাকায় মুদি দোকানের ব্যবসা করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ব্যবসায় প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ার পর থেকেই স্ত্রীর সঙ্গে তার পারিবারিক বিরোধ বাড়তে থাকে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
খিলক্ষেত থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মাদ সোহরাব আল হোসাইন জানিয়েছেন, মুক্তাকে মারধরের যে ভিডিও পাওয়া গেছে, সেটি তাঁর মৃত্যুর তিন দিন আগের।
তিনি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে মুক্তার মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশ ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কল বিশ্লেষণে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগের একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে ৯৯৯-এ ১৮ হাজার ৬২৬টি কল আসে। ২০২৪ সালে এ ধরনের কলের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৩৩টি; এর মধ্যে ১১ হাজার ৪১৮টি ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ।
২০২৩ সালে মোট ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে এ সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫৬০। আর ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।
মুক্তার মৃত্যুর ঘটনা আবারও পারিবারিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতনের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।