

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা হতে যাচ্ছে। পাশাপাশি রাজশাহী-কলকাতা রুটে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু, মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনা এবং রাতে ট্রেন চালানোর মতো একাধিক প্রস্তাবও আলোচনায় উঠবে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় শুরু হতে যাচ্ছে দুই দিনব্যাপী আন্তসরকার রেলওয়ে বৈঠক (আইজিআরএম)। বাংলাদেশ ও ভারতের রেল কর্তৃপক্ষের বার্ষিক এ বৈঠকে দুই দেশের রেল যোগাযোগের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের আলোচ্যসূচি ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা তিনটি আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। দুই দেশ সম্মত হলে আগামী মাস থেকেই ট্রেনগুলো আবার চলাচল শুরু করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ঠিক কবে থেকে ট্রেন চালু হবে বা আগের সময়সূচিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না তা বৈঠকের আগে নিশ্চিত করা হয়নি।
বন্ধ থাকা তিন ট্রেন চালুর পাশাপাশি রাজশাহী থেকে কলকাতা রুটে নতুন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ। এতে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের কলকাতার রেল যোগাযোগ আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এ ছাড়া ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেসকে পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনার আগ্রহ প্রকাশ করবে বাংলাদেশ। বর্তমানে এই ট্রেনটি যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করে।
রেল কর্তৃপক্ষের আলোচনায় রাতের সময় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার বিষয়টিও থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারতের আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো দিনের বেলায় চলাচল করে।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ট্রেনগুলোতে পার্সেল বুকিংয়ের সুযোগ চালুর প্রস্তাবও দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যাত্রীবাহী কোচের সঙ্গে একটি বা দুটি পার্সেল কোচ যুক্ত করার বিষয়টি আলোচনায় তোলা হবে।
এর ফলে দুই দেশের মধ্যে ছোট পরিসরের পণ্য ও পার্সেল পরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ-ভারতের আন্তদেশীয় ট্রেন চলাচল স্থগিত হয়ে যায়। ১৯ জুলাই থেকে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এর আগে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ট্রেন যোগাযোগ দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। ২০২০ সালের ১৫ মার্চ আন্তদেশীয় ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ার পর প্রায় ২৬ মাস পর মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেস আবার চালু হয়েছিল।
জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন আর চালু হয়নি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে ভিসা কার্যক্রমে জটিলতা ও কড়াকড়ির কথা জানিয়েছেন রেল কর্মকর্তারা।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ভ্রমণ ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল। বাংলাদেশও ভিসা প্রদানে কড়াকড়ি করায় যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর বিষয়টি এগোয়নি। পরবর্তী সময়ে দুই দেশ ধীরে ধীরে ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়ায় ট্রেন চালুর বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, যাত্রীবাহী ট্রেন পুনরায় চালুসহ দুই দেশের রেল যোগাযোগসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় বৈঠকে আলোচনা হবে। আলোচনার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং পরে দুই দেশের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।
তবে শুধু রেল কর্তৃপক্ষের আলোচনাই চূড়ান্ত নয়। ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে দুই দেশের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতও প্রয়োজন হবে। তাই আইজিআরএম বৈঠকে সমঝোতা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আসতে পারে।
যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেনের চলাচল বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রহনপুর-সিংহাবাদ রুটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন চালুর প্রস্তাব আলোচনায় তোলা হবে।
বর্তমানে এসব রুটে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সীমিত সময়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। সময় বাড়ানো গেলে দুই দেশের বাণিজ্যিক রেল যোগাযোগ আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষ ভিসা ব্যবস্থার কিছু জটিলতা দূর করার বিষয়ও আলোচনায় তুলতে যাচ্ছে। বর্তমানে যাত্রী যে পথে ভারতে প্রবেশ করেন, অনেক ক্ষেত্রে ফেরার সময়ও একই ধরনের যাতায়াতপথ অনুসরণ করতে হয়।
বিমানে ভারতে প্রবেশ করে ট্রেনে বা সড়কপথে দেশে ফেরার সুযোগ এবং ট্রেনে গিয়ে অন্য পথে ফেরার মতো নমনীয় ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে আলোচনা করতে চায় বাংলাদেশ।
দুই দেশের রেল যোগাযোগের প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ও আইজিআরএম বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে রয়েছে। ভারতীয় রেলের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া অর্থের বিষয়টি উত্থাপন করা হবে।
এ ছাড়া ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা যেসব ওয়াগনের নিয়মিত বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা পিরিয়ডিক ওভারহলিংয়ের প্রয়োজন হয়েছে, সেগুলোর বিষয়েও আলোচনা হবে।
ভারতীয় সরকারের ঋণে বাংলাদেশ রেলের কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এসব প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকার কমলাপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণের প্রকল্প অন্যতম। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পটির কাজ ব্যাহত হলেও বর্তমানে আবার কাজ চলছে। তবে এর গতি নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
এ ছাড়া কিছু প্রকল্পে ভারতের অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি, বাংলাদেশ রেলের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং দুই দেশের রেল অবকাঠামোগত সহযোগিতার বিষয়ও বৈঠকে আলোচিত হবে।
ঢাকা-কলকাতা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয় ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল। পরে ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা-কলকাতা রুটে চালু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস।
ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটে মিতালী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের ১ জুন।
এই তিনটি ট্রেনই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর এবার এগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় দুই দেশের যাত্রীদের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
মঙ্গলবার আইজিআরএম বৈঠকে তিনটি ট্রেন চালুর বিষয়ে কী ধরনের সমঝোতা হয় সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি নতুন ট্রেন, নতুন রুট, রাতের ট্রেন এবং পণ্য পরিবহনের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগের পরিধিও আরও বিস্তৃত হতে পারে।