
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চলমান সংকট নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তীব্র লোডশেডিং, বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং বিপুল পরিমাণ বকেয়া সব মিলিয়ে চাপের মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত।
সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, গত দেড় বছরে নেওয়া কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক কয়েকটি প্রকল্প বাতিলের প্রভাব বর্তমান সংকটকে আরও তীব্র করেছে। তবে বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, আর্থিক চাপ ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও সংকটের পেছনে রয়েছে বলে মনে করছেন অন্যরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইনের দায়মুক্তির বিধান বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ রয়েছে, পূর্বে সম্পাদিত কয়েকটি চুক্তি বহাল থাকলেও পাইপলাইনে থাকা সরকারি, বেসরকারি ও যৌথ উদ্যোগের ৩৭টি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়। এসব প্রকল্পের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৩ হাজার ২৮৭ মেগাওয়াট।
পরবর্তীতে ৫ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ৫৫টি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তা বা ‘সভরেন গ্যারান্টি’ না থাকায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রত্যাশিত মাত্রায় দেখা যায়নি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। প্রায় ৯০০ মেগাওয়াটের প্রকল্পের জন্য আবেদন জমা পড়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আর্থিক সংকটের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বকেয়া অর্থ। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশি-বিদেশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বকেয়া প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এর মধ্যে বেসরকারি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বিল পরিশোধ না হওয়ায় অনেক বেসরকারি উদ্যোক্তা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কয়লা ও গ্যাসের বিল বকেয়া থাকায় কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের মধ্যে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আর্জেন্ট এলএনজি’র সঙ্গে একটি নন-বাইন্ডিং চুক্তি করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)।
চুক্তিটি নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলাকে সম্পৃক্ত না করে এবং উন্মুক্ত দরপত্রের বাইরে গিয়ে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে চুক্তিটি নন-বাইন্ডিং হওয়ায় এর বাস্তবায়ন ও আর্থিক প্রভাব নিয়ে আলাদা মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কে থাকা রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একদিকে কয়েকটি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে, অন্যদিকে রামপাল প্রকল্প নিয়ে বড় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি এ কারণে সরকারের নীতিতে বৈপরীত্য রয়েছে বলে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছে।
বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্তব্য করেছেন, আগের সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাত দুর্বল অবস্থায় থাকলেও পরবর্তী সময়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনার কারণে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়েছে।
তিনি জানান, বাতিল হওয়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোর মধ্যে ৩১টির লেটার অব ইনটেন্ট (এলওআই) পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করেন, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু সাম্প্রতিক সরকারের সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। গত কয়েক বছরের অতিরিক্ত ব্যয়, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিপুল বকেয়াও বর্তমান সংকটের সঙ্গে জড়িত।
তবে তাদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে ঘন ঘন নীতিগত পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বকেয়া পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
ফলে বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দ্রুত বকেয়া পরিশোধ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল, নাকি দীর্ঘদিনের জমে থাকা আর্থিক ও নীতিগত সমস্যার সম্মিলিত পরিণতি এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।