

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমর্থন আবারও স্পষ্ট করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই ভাষণে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশের পুনর্গঠনে সরকারের ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন’ বা ‘থ্রি-আর’ কৌশলের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ বিতর্কে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় তুলে ধরেন।
ফিলিস্তিন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, সেখানকার জনগণের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগ বাংলাদেশের মানুষের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান সংঘাতের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বহু দেশে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। এর ফলে বিপুল মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং নানা ধরনের মানবিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে যুদ্ধ ও সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন সংঘাতের কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
এসব সংকট মোকাবিলায় সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তোলার পরিবর্তে আলোচনা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০২৪ সালে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন গণতান্ত্রিক পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল উৎস জনগণ। গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ভিত্তিকে শক্তিশালী করার বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
দেশ পুনর্গঠনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকন্সট্রাকশন’—এই তিনটি ধারণার সমন্বয়ে ‘থ্রি-আর’ কৌশলের কথা তুলে ধরেন। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
ভাষণে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে উৎপাদন ও শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
নারীদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জাতিসংঘের মঞ্চে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সংকটগুলোর মধ্যে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকেও গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। সংকটটির টেকসই সমাধানের জন্য মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন সহায়তা জোরদারের আহ্বানও জানান প্রধানমন্ত্রী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রসঙ্গেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ এবং সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
এ ছাড়া নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং প্রযুক্তিতে সমান সুযোগসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি।
ভাষণের শেষাংশে জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জলবায়ু ন্যায়বিচার, প্রযুক্তিতে সমান সুযোগ এবং সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে আসে।