

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে তাকে বহনকারী তুর্কিশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। তার সঙ্গে রয়েছেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানসহ সফরসঙ্গীরা। নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্কে অবস্থান করবেন।
নিউইয়র্ক সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ২৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম বক্তব্য।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’।
এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি ২ জুন ২০২৬ এ পদটির জন্য নির্বাচিত হন।
ফলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যখন সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন, একই অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্বে থাকছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর ২২ সেপ্টেম্বর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয়েছে। রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজিত স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী কার্যক্রমে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কর্মসূচিও রয়েছে।
সফরের কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।
সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারসহ বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচিতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি বিশেষ সাইড ইভেন্ট রয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে অনুষ্ঠেয় এই আলোচনায় মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, টেকসই ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়ে আসছে।
২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
এখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কর্মসূচিও রয়েছে।
কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এসব আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় স্থান পেতে পারে।
সফরকালে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে।
মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ অধিবেশনের ফাঁকে অর্থনৈতিক কূটনীতির বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ ও কর্মসংস্থানের বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে ৩৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রয়েছে বলে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক সময় রাত ১১টার দিকে এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে তার প্রথম বক্তব্য এবং ধারাবাহিক দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকের মধ্য দিয়ে এই সফরের মূল কর্মসূচি সম্পন্ন হবে।