

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দলটি ২২৪ জন প্রার্থীর জন্য মোট ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা ব্যয় করেছে। ব্যয়ের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ২৮৮ জন প্রার্থীর বিপরীতে দলটির নির্বাচনী ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা।
অন্যদিকে, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৭টি দল তাদের দলীয় নির্বাচনী ব্যয় ‘শূন্য’ দেখিয়েছে। অর্থাৎ এসব দল প্রার্থী দেওয়ার পরও দলীয়ভাবে কোনো নির্বাচনী ব্যয় হয়নি বলে ইসিতে জমা দেওয়া বিবরণীতে উল্লেখ করেছে।
ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নকারী রাজনৈতিক দলের ব্যয় বিবরণী’ বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসিতে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশ নেয়।
ইসিতে জমা দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী ২২৪ জন প্রার্থী দিয়ে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা ব্যয় করেছে। বিএনপি ২৮৮ জন প্রার্থী দিয়ে ব্যয় করেছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টি-জেপি ১০ জন প্রার্থীর বিপরীতে ১৮ হাজার ৮৭৫ টাকা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৬৫ জন প্রার্থীর জন্য ২০ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৩ টাকা এবং গণতন্ত্রী পার্টি একজন প্রার্থীর জন্য ১ লাখ টাকা ব্যয় দেখিয়েছে।
জাতীয় পার্টি ১৯২ জন প্রার্থীর বিপরীতে ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ২৬ জন প্রার্থীর জন্য ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ৩৯ জন প্রার্থীর জন্য ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।
বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি ৫ জন প্রার্থী দিয়ে ২০ লাখ ৬ হাজার ৮৬৭ টাকা ৭২ পয়সা ব্যয় দেখিয়েছে।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ১৯ জন প্রার্থীর জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার ১৫০ টাকা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৩ জন প্রার্থীর জন্য ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৩ জন প্রার্থীর জন্য ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭১ টাকা ব্যয় করেছে।
বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ২৬ জন প্রার্থীর বিপরীতে ১ লাখ টাকা, খেলাফত মজলিস ৩৪ জন প্রার্থীর জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল ৬ জন প্রার্থীর জন্য ৩ হাজার টাকা ব্যয় করেছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট ১৯ জন প্রার্থীর জন্য ২ লাখ ২৭ হাজার ১৫২ টাকা, বাংলাদেশ জাসদ ১১ জন প্রার্থীর জন্য ২ লাখ টাকা, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ৩০ জন প্রার্থীর জন্য ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭১০ টাকা এবং গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি) ৯০ জন প্রার্থীর জন্য ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় দেখিয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩২ জন প্রার্থীর বিপরীতে ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ টাকা ব্যয় করেছে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) ২৯ জন প্রার্থীর জন্য ১ লাখ ৯ হাজার টাকা এবং আমজনতার দল ১৫ জন প্রার্থীর জন্য ৪২ হাজার ৫২০ টাকা ব্যয় করেছে।
বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২৮ জন প্রার্থীর জন্য ব্যয় দেখিয়েছে ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকা।
ইসিতে জমা দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২৭টি রাজনৈতিক দল দলীয়ভাবে কোনো ব্যয় করেনি বলে জানিয়েছে। এসব দলের মধ্যে রয়েছে—লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাকের পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)।
এ তালিকায় আরও রয়েছে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ কংগ্রেস, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি), জনতার দল এবং বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টি (বিইপি)।
এসব দলের প্রার্থীর সংখ্যা এক থেকে ৪২ জন পর্যন্ত। প্রার্থী দেওয়ার পরও দলীয়ভাবে কোনো অর্থ ব্যয় করা হয়নি বলে তারা হিসাব বিবরণীতে উল্লেখ করেছে।
দলগুলোর নেতাদের বক্তব্য, নির্বাচনে প্রার্থীদের কাছ থেকে মনোনয়ন বা অন্য কোনো খাতে অর্থ নেওয়া হয়নি। একইভাবে দলীয় তহবিল থেকেও কোনো প্রার্থীকে নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য অর্থ দেওয়া হয়নি। এ কারণে দলীয় নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব শূন্য দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, তাদের দল নির্বাচনে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। প্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়নি এবং দলীয়ভাবেও কাউকে টাকা দেওয়া হয়নি। ফলে দলীয় ব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে।
একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন জনতার দলের মহাসচিব আজম খান। তিনি জানান, মনোনয়নপত্রের জন্য প্রার্থীদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি এবং দল থেকেও কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। এ কারণে দলীয় নির্বাচনী ব্যয় শূন্য দেখানো হয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) বিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব নিরীক্ষার জন্য ইসিতে জমা দিতে হয়।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করা হয়। সে হিসাবে দলগুলোর ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল ১৩ মে।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ২২টি দল হিসাব জমা না দেওয়ায় এবং কয়েকটি দল সময় বাড়ানোর আবেদন করায় ইসি এক মাস সময় বাড়িয়ে ১৩ জুনের মধ্যে হিসাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
এরপরও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ সাতটি দল হিসাব জমা না দেওয়ায় গত ২৫ জুন তাদের শোকজ নোটিশ দেয় ইসি। নোটিশে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে দ্রুত হিসাব জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে এসব দলও তাদের নির্বাচনী ব্যয়ের বিবরণী জমা দেয়।
পরবর্তীতে তিন ধাপে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর ব্যয়ের হিসাব ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সেই হিসাবেই দলীয় নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে জামায়াতে ইসলামীকে শীর্ষে এবং বিএনপিকে দ্বিতীয় অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।