

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ‘রাইটার’দের একযোগে বদলি করা হয়েছে। গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ নথি পাচারের আশঙ্কা এবং কয়েকজনের সাবেক ও পলাতক পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে বদলির সরকারি আদেশে এসব কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে বদলির কারণ হিসেবে ‘জনস্বার্থের কথা’ বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বদলি হওয়া অনেক সদস্যকে বিভিন্ন থানায় না দিয়ে ডিএমপির রিজার্ভসহ তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ ও নন-অপারেশনাল ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডিএমপির আটটি ক্রাইম বিভাগের অধীন বিভিন্ন থানায় কর্মরত কম্পিউটার অপারেটরদের একটি বড় অংশকে বদলি করা হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ডিএমপি কমিশনারের ৪৪৪৩ নম্বর বদলি আদেশে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দেওয়া হয়।
আদেশে ডিএমপির উপকমিশনার (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) শাহরিয়ার আলী এবং অতিরিক্ত উপকমিশনার ফাহমিদা হক শেলী স্বাক্ষর করেন।
বদলির কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদনে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
থানার রাইটারদের কাজের মধ্যে রয়েছে অনলাইন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) লেখা, বিভিন্ন নথি প্রস্তুত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলো সংশ্লিষ্ট সার্ভারে সংরক্ষণ বা আপলোড করা। ফলে থানার নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও নথির সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কয়েকজন রাইটার চাকরিচ্যুত বা পলাতক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন—এমন সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তাদের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় তথ্য বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই নজরদারি ও বদলির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
তবে বদলি হওয়া কয়েকজন কম্পিউটার অপারেটর এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তারা বিভিন্ন জেলার তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ থানায় কর্মরত ছিলেন। পরে দক্ষতা অনুযায়ী তাদের ডিএমপির বিভিন্ন থানায় পদায়ন করা হয়। ফলে আগের কর্মস্থলের পলাতক বা চাকরিচ্যুত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ সঠিক নয় বলে তারা দাবি করেন।
ডিএমপির এক কর্মকর্তা বলেন, রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি রাকিবুল হাসানের একটি অডিও ভাইরাল হওয়ার পর গোপন তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে নজর দেওয়া হয়। এরপর এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে থানাগুলোতে দায়িত্ব পালন করা কম্পিউটার অপারেটরদের অনেককে বদলি করা হয়েছে এবং কয়েকজনের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
রাইটারদের একযোগে বদলি করা হলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার পর্যন্ত অনেক থানায় তাদের স্থলে নতুন কম্পিউটার অপারেটর পদায়ন করা হয়নি।
থানায় এসব কর্মীর তদারকির দায়িত্ব সাধারণত এসআই পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ওপর থাকে। তাদের অনেক থানায় ‘স্টেটমেন্ট অফিসার’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, অভিজ্ঞ রাইটারদের বদলি হলেও দ্রুত নতুন জনবল দেওয়া না হলে থানার নিয়মিত প্রশাসনিক ও নথিপত্রের কাজে সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ডিএমপির দুটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাইটারদের কাজের জন্য প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল প্রয়োজন। নতুনদের পর্যাপ্ত দক্ষতা না থাকলে থানার দৈনন্দিন কার্যক্রমে ধীরগতি তৈরি হতে পারে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ থানার স্টেটমেন্ট অফিসারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে চারজন রাইটার দায়িত্ব পালন করতেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে বদলি করা হলেও নতুন কাউকে পদায়ন করা হয়নি। ফলে থানার বিভিন্ন নথি প্রস্তুত ও কম্পিউটারভিত্তিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
তবে রাইটারদের গণবদলির সঙ্গে তথ্য পাচারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন ডিএমপির অ্যাডমিন বিভাগে অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাসুদ করিম।
তিনি জানিয়েছেন, এসব বদলি নিয়মিত বদলি প্রক্রিয়ার অংশ। তবে কোনো সদস্যকে সংশ্লিষ্ট ইউনিটে রাখার প্রয়োজন হলে বদলি হওয়া সদস্যদের সেখানেও রাখা হচ্ছে।
ফলে রাইটারদের গণবদলির পেছনে প্রকৃত কারণ এবং এর ফলে থানাগুলোর নিয়মিত কাজে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।