

শক্তিশালী টাইফুন ‘দুজুয়ান’-এর প্রভাবে জাপানের রাজধানী টোকিওসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। ঝড়ের প্রভাবে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ঝড়জনিত দুর্যোগে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত চারজনে দাঁড়িয়েছে এবং ছয়জন নিখোঁজ রয়েছেন।
এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর সকালে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুজন নিহত ও চারজন নিখোঁজের তথ্য জানানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব হালনাগাদ হলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার তথ্য আসে।
দুজুয়ানের প্রভাবে টোকিও ও আশপাশের এলাকায় ঝুঁকি বাড়ায় ১৬ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ বা নির্দেশ দেওয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধস ও বন্যার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়।
সোমবার ঝড়টি টোকিওর কাছাকাছি কাতসুরা শহরের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল। তখন এর বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৪৪ কিলোমিটার। পরে মঙ্গলবার ভোরের দিকে ঝড়টি জাপানের উপকূলীয় এলাকা পেরিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে সরে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে অগ্রসর হয়।
তবে ঝড় সরে গেলেও ভারী বৃষ্টির কারণে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে সতর্ক করেছে জাপানের আবহাওয়া সংস্থা (JMA)। সংস্থাটি জানিয়েছে, কিছু এলাকায় সেপ্টেম্বর মাসের স্বাভাবিক মাসিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভারী বৃষ্টির কারণে কানাগাওয়া ও চিবা প্রদেশসহ টোকিও সংলগ্ন এলাকায় একাধিক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। ইয়োকোসুকায় ষাটের কোঠার এক নারী ভূমিধসে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে আটকা পড়ে মারা যান। অন্য এলাকাতেও ভূমিধস ও ধসে পড়া স্থাপনার কারণে প্রাণহানি ঘটে। নিখোঁজদের সন্ধানে পুলিশ, দমকল বাহিনী ও উদ্ধারকারী দল অভিযান চালাচ্ছে।
প্রবল বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটও পানিতে ডুবে যায়। টোকিওর পূর্বে ইচিকাওয়া এবং পর্যটননগরী কামাকুরার বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যান চলাচল ব্যাহত হয়। স্থানীয় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলেছে।
টাইফুনের কারণে জাপানের বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। জাপান এয়ারলাইনস (JAL) ১৩৫টি এবং অল নিপ্পন এয়ারওয়েজ (ANA) ১৪০টি ফ্লাইট বাতিল করে। এতে বিভিন্ন বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক যাত্রী আটকা পড়েন বা যাত্রা পিছিয়ে দিতে বাধ্য হন।
ঝড়ের প্রভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহও ব্যাহত হয়। বিভিন্ন সময়ে কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার বাড়িঘর বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তী হিসাবে টোকিওসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৪৬ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকার খবর পাওয়া যায়।
বিমান চলাচলের পাশাপাশি জাপানের রেল যোগাযোগেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। টোকিও ও ওসাকার মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বুলেট ট্রেনসহ বিভিন্ন রেলপথে সেবা স্থগিত বা সীমিত করা হয়। চিবা, ইবারাকি ও টোকিওর আশপাশের কিছু রুটেও ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার কারণে সড়ক যোগাযোগও বিভিন্ন এলাকায় ব্যাহত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ও নিম্নাঞ্চলে মানুষকে অপ্রয়োজনে চলাচল না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
দুজুয়ানের প্রভাবে জাপানের সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক আয়োজনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বড় ভিডিও গেম প্রদর্শনী ‘টোকিও গেম শো’-এর শেষ দিনের কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের আগেই বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া চিবা এলাকায় একটি বড় সংগীত উৎসব ও একটি বেসবল ম্যাচও বাতিল করা হয়েছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন আউটডোর অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় আয়োজকরা।
টাইফুনের আগে থেকেই জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ভারী বৃষ্টির বিষয়ে সতর্ক করেছিল। সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঝড়ের প্রভাবে কিছু এলাকায় সেপ্টেম্বর মাসের গড় বৃষ্টিপাতের চেয়েও বেশি বৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে নদীর পানি বেড়ে যাওয়া, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা তৈরি হয়।
ইজু দ্বীপপুঞ্জের ওশিমা এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় ৬০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতের তথ্যও পাওয়া গেছে। অতিবৃষ্টির কারণে সেখানে ভূমিধসের সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
দুজুয়ান চলতি বছরে জাপানে আঘাত হানা ২৫তম টাইফুন। মঙ্গলবারের দিকে এটি জাপানের পূর্ব উপকূল থেকে সরে উত্তর-পূর্ব দিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে এগিয়ে যায়। ঝড়ের মূল প্রভাব কমে এলেও এর রেখে যাওয়া বন্যা, ভূমিধস ও যোগাযোগ সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন।
কর্তৃপক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব সংগ্রহ করছে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য অনুসরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।