

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ বাড়ছে। রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ১৩৪টি নিটওয়্যার কারখানার মধ্যে আগস্টের শেষ দিক থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে অথবা কমেছে। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানা উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। অনেক কারখানা নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে পারছে না। সময়সীমা ধরে রাখতে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত খরচে বিমানে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ ক্রেতা ধরে রাখতে কম দামে অর্ডার নিতে বাধ্য হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে আগস্টের শেষ দিক থেকে জরিপে অংশ নেওয়া ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করেছেন অথবা অর্ডারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন।
একই জরিপে ৭৮ শতাংশ কারখানা জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। এর ফলে উৎপাদন পরিকল্পনা, পণ্য সরবরাহ এবং ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে সংকটের মধ্যেও কিছু কারখানা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার উপকণ্ঠে অবস্থিত ৪এ ইয়ার্ন ডাইং তার অন্যতম উদাহরণ।
ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও নেক্সটের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সরবরাহকারী এই কারখানায় এখনো হুডি তৈরি ও পোশাকে ব্র্যান্ডের লোগো সংযোজনের কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কর্মী রয়েছেন।
২০১৯ সাল থেকে ৪এ নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করে রেখেছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে জাতীয় গ্রিড বা একটি নির্দিষ্ট জ্বালানি উৎসের ওপর তাদের নির্ভরতা তুলনামূলক কম।
৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণ হয়। বাকি বিদ্যুতের বড় অংশ আসে নিজস্ব গ্যাস ও ডিজেলচালিত উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে।
কারখানাটির ছাদের প্রায় পুরোটাই সৌর প্যানেলে ঢাকা। ফলে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট তৈরি হলেও প্রতিষ্ঠানটি আপাতত উৎপাদন চালু রাখতে পারছে।
প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্ণধার আবদুল্লাহ হিল নকীব বলেন, তারা কখনো একটি মাত্র জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর করেননি। প্রতিটি ব্যবস্থার বিকল্প রাখার কারণে সংকটের সময় উৎপাদন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলেও ৪এ ইয়ার্ন ডাইং পুরোপুরি সংকটমুক্ত নয়। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন ব্যয় ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
নকীবের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির মাসিক অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন সচল রাখা সম্ভব হলেও তার জন্য বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাড়তি ব্যয় প্রতিষ্ঠানটি এখন পর্যন্ত সামাল দিতে পারলেও সব পোশাক কারখানার পক্ষে একই ধরনের বিনিয়োগ ও ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়।
ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ সরবরাহে আকস্মিক বিঘ্ন ঘটলেও উৎপাদন চালিয়ে যেতে শিল্প পর্যায়ের বড় ব্যাটারি ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে ৪এ।
প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের কোনো উৎস সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাটারি থেকে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই দেশে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এতে পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী খাতের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সরকার জ্বালানির দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নতুন দামে ডিজেলের মূল্য ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা হয়েছে। এর আগে চলতি বছর এপ্রিল ও জুনেও জ্বালানির দাম বাড়ানো হয়েছিল।
জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ করাও অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে কিছু কারখানাকে সড়ক বা সমুদ্রপথের বদলে বিমানে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে।
এতে পরিবহন ব্যয় কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রেতা ধরে রাখতে পণ্যের দামে ছাড় দিচ্ছে।
পোশাক রপ্তানিকারক শহিদুল্লাহ আজিম বলেন, পোশাকশিল্পে মুনাফার হার এমনিতেই কম। জ্বালানি, উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বাড়ায় মুনাফার ওপর আরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
শহিদুল্লাহ আজিম জানান, কানাডার একটি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৫ হাজার পোশাকের অর্ডার পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল। শেষ পর্যন্ত ওই ক্রেতা মাত্র ৮ হাজার পোশাকের অর্ডার দিয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট নিয়ে ক্রেতাদের আস্থায় প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি ক্রয়াদেশ ধরে রাখাও পোশাক কারখানাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও জ্বালানি সংকট নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান হয়তো সামাল দিতে পারবে। কিন্তু গ্যাসের ঘাটতি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট উৎপাদনের জন্য আরও বড় সমস্যা।
তার মতে, বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ ভারত ও ভিয়েতনামে একই ধরনের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তুলনামূলকভাবে কম থাকায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রপ্তানি আয়ের বড় ভরসা পোশাক খাত
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এই খাতে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন এবং দেশের জিডিপিতে খাতটির অবদান প্রায় ১০ শতাংশ।
ফলে জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কারখানা বা উদ্যোক্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির বিষয়ও জড়িত।
রয়টার্সের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আমদানি করা এলএনজির ওপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশকে বিকল্প ও তুলনামূলক ব্যয়বহুল স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও শিল্প উৎপাদনে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প প্রবৃদ্ধির গতি কমার আশঙ্কার কথাও বাংলাদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে গ্যাস আমদানির ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়ায় সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের ওপরও প্রভাব পড়ছে।
৪এ ইয়ার্ন ডাইংয়ের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, একাধিক জ্বালানি উৎস, সৌরবিদ্যুৎ এবং নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলে সংকটের সময় উৎপাদন সচল রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে এমন অবকাঠামো গড়ে তুলতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ফলে ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য এটি সহজ সমাধান নয়। শিল্পের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহের বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা এখন পোশাক খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।