

শীতকালীন সবজির মৌসুম সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়েছে মুন্সিগঞ্জের বীজতলাগুলোতে। সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সারি সারি বীজতলায় বেড়ে উঠছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ নানা ধরনের সবজির চারা। স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব চারা এখন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছে।
চারা উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষকদের হিসাবে, আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা তিন থেকে চার মাসের মৌসুমে মুন্সিগঞ্জে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে প্রতি বছর আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত আগাম শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। এসব বীজতলায় উচ্চফলনশীল ও উন্নত জাতের ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন সবজির চারা তৈরি করা হয়।
স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে মুন্সিগঞ্জের চারা যাচ্ছে সাভার, মানিকগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
সোমবার সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যেরবাগ, কেপিবাগ ও সিকদার বাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বীজতলা বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। চাটাইয়ের নিচে সারি সারি বেডে বেড়ে উঠছে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও মরিচের চারা।
কেউ চারায় পানি দিচ্ছেন, কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন। আবার কেউ নতুন বীজতলা তৈরির কাজে ব্যস্ত। মৌসুম শুরু হওয়ায় সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এসব এলাকায় কৃষক ও শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো।
পঞ্চসারের সিকদার বাড়ি এলাকার চারা চাষি আতিক হাসান জানান, ৫০ শতক জমিতে তাঁর প্রায় ৫০টি বীজতলা রয়েছে। একটি মৌসুমে প্রতিটি বীজতলায় তিন দফায় চারা উৎপাদন করা হয়।
তিনি বলেন, প্রতিটি বীজতলার এক দফার চারা কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে তাঁর বীজতলা থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়।
আতিক হাসান বলেন, চারা উৎপাদনকারীরা সাধারণত কাছাকাছি দামে চারা বিক্রি করেন। তবে উন্নত জাত ও ভালো মানের চারার চাহিদা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেগুলোর বিক্রিও ভালো হয়।
চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুন্সিগঞ্জে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রির ঐতিহ্য বহু পুরোনো। স্বাধীনতার আগেও এ অঞ্চলে সীমিত পরিসরে চারা উৎপাদন করা হতো। তখন মূলত জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় এসব চারা বিক্রি করা হতো।
তবে গত প্রায় দুই দশকে ধীরে ধীরে এ ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। কৃষকেরা খৈল, জৈবসার ও প্রয়োজন অনুযায়ী রাসায়নিক সার ব্যবহার করে উন্নত জাতের চারা উৎপাদনে মনোযোগ দেন। একপর্যায়ে মুন্সিগঞ্জের চারার মান ও সুনাম জেলার সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
কৃষকদের হিসাবে, বর্তমানে পঞ্চসার, বজ্রযোগিনী ও রামপাল এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দেড় শতাধিক চারা উৎপাদন প্রকল্প রয়েছে। এর বেশির ভাগই পঞ্চসার এলাকায়।
সাধারণত আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে বীজতলায় চারা উৎপাদনের কাজ শুরু হয়। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিক্রি জমে ওঠে। কয়েক দফায় চারা উৎপাদন ও বিক্রির কার্যক্রম চলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত।
সিকদার বাড়ি এলাকার চারা ব্যবসায়ী লিটন শিকদার জানান, মুন্সিগঞ্জের বীজতলাগুলোতে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করা হয়। ভালো মানের এক কেজি বীজের দাম এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তার মতে, এসব বীজ থেকে উৎপাদিত চারা ব্যবহার করে কৃষকেরা ভালো ফলন পাওয়ার আশা করেন। এ কারণে মুন্সিগঞ্জের চারার প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের আগ্রহ রয়েছে।
তবে প্রতিবছর লাভের পরিমাণ সমান থাকে না বলেও জানান তিনি। কোনো মৌসুমে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ হয়, আবার কোনো বছর নানা কারণে লাভ কমে যায়। তারপরও পারিবারিকভাবে চলে আসা এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
চারা উৎপাদন ও পরিচর্যায় বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই চারা বিক্রি করতে হয়। অতিরিক্ত রোদ, ভারী বৃষ্টি কিংবা বীজতলায় পানি জমে গেলে চারার ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
এ কারণে অনেক বীজতলার ওপর বাঁশের তৈরি চাটাই দিয়ে অস্থায়ী ছাউনি দেওয়া হয়। আবহাওয়ার পরিস্থিতি বুঝে কখনো চাটাই সরিয়ে রোদ দেওয়া হয়, আবার অতিরিক্ত রোদ বা বৃষ্টির সময় তা দিয়ে চারাগুলো ঢেকে রাখা হয়।
শ্রমিক বাবু দেওয়ান বলেন, চারা উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই সতর্ক থাকতে হয়। অঙ্কুরোদ্গমের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চারা বিক্রি করতে হয়। অতিরিক্ত রোদ ও বৃষ্টি চারার জন্য ক্ষতিকর। তাই পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও বীজতলার আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর দিতে হয়।
লাভজনক হলেও চারা উৎপাদন ব্যবসায় অন্যতম বড় ঝুঁকি আবহাওয়া। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে টানা বৃষ্টি হলে একদিকে যেমন বীজতলার চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে অন্যদিকে কৃষকেরা জমিতে সবজি চাষ শুরু করতে দেরি করায় চারার চাহিদাও কমে যেতে পারে।
কেপিবাগ এলাকার কৃষক স্বপন দেওয়ান বলেন, তাদের কাছে সবজি উৎপাদনের তুলনায় চারা উৎপাদন বেশি লাভজনক। বছরের তিন-চার মাস তারা ব্যাপকভাবে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করেন। এই সময়ের আয় দিয়েই পরিবারের অনেক খরচ মেটানো সম্ভব হয়।
তিনি জানান, গত বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিতে তাদের বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। একই সঙ্গে বিক্রিও কমে যায়। এবারও মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি হওয়ায় তারা কিছুটা উদ্বিগ্ন। কয়েক দিনের মধ্যে বিক্রি বাড়ার কথা থাকলেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে অনেক চারা বিক্রির আগেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
একই এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে সার ও বীজের দাম আগের তুলনায় বেড়েছে। এখনো পুরোপুরি চারা বিক্রি শুরু হয়নি। এর মধ্যে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ উঠে আসা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চারা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কৃষকেরা ব্যবসাটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহায়তা প্রত্যাশা করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান জানান, সদর উপজেলায় চারা উৎপাদন বর্তমানে কৃষকদের জন্য একটি লাভজনক কৃষিখাতে পরিণত হয়েছে।
পঞ্চসার, রামপাল ও বজ্রযোগিনী এলাকায় ২৫ থেকে ৩০ জন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন যারা শুধু শীত মৌসুমেই নয়, সারা বছর উন্নত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন করছেন।
তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জের চারার জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠিত বাজার রয়েছে এবং চাহিদাও উল্লেখযোগ্য। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, চারা উৎপাদনে প্রতিবিঘা জমি থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন কৃষকেরা।
চারা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ আরও সম্প্রসারণে কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মুন্সিগঞ্জের এই চারা ব্যবসা এখন শুধু স্থানীয় কৃষির একটি মৌসুমি কর্মকাণ্ড নয়; বরং জেলার অনেক কৃষকের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমেও বিপুল পরিমাণ চারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের কৃষকের হাতে পৌঁছাবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।