
সভ্যতা বিবর্তনশীল ও চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে। তথাকথিত বর্বর যুগ হতে কোথায় ও কখন মানুষ আধুনিক অর্থে সভ্যতার স্পর্শ পেলো তা অনুমান করা যায় মাত্র। আমরা জানি কৃষি বিপ্লবের মূল রূপকার হলেন নারী। মাতৃত্ব কেবল একটি জৈবিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি সুমহান দায়িত্ব, যার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ব্যক্তিসত্তা, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।” এই উক্তিটি মাতৃত্বের গভীর সামাজিক তাৎপর্যকে স্পষ্ট করে। এ প্রসঙ্গে মহানবি (সা.) এর বাণী প্রনিধাণযোগ্য- ‘‘সেই মায়ের সাথে উচ্চস্বরে কথা বলোনা, যেই মা তোমাকে কথা বলা শিখিয়েছে। রাসূল (সা.) বলেছেন, তোমার নিকট উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার তোমার মা, তোমার মা, তোমার মা, অতঃপর তোমার বাবা।’’ (বুখারী শরীফ- ৫৯৭১)। তাই সচেতন মা-কে সভ্যতার মূল রূপকার বলা সম্পূর্ণ যথার্থ।
একজন সচেতন মা হলেন সন্তানের অন্তরে ন্যায়-অন্যায়, সততা এবং মানবিক গুণাবলির বীজ বপনের মূর্ত প্রতীক। সন্তানের শারিরিক সুস্থতার পাশাপাশি সন্তানের মানসিক সুস্থতা, চিন্তাশক্তি এবং আত্মমর্যাদার সঠিক বিকাশ ঘটাতে মা মুখ্য দায়িত্ব পালন করেন। সন্তানকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখানো, পরমতসহিষ্ণুতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ শিক্ষা দেওয়া, মায়ের দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে পড়ে। দেখা যাবে একটা সময় সেই শিশু ভবিষ্যতে সমাজের এক আলোকিত নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। কোনো জাতির সামগ্রিক নৈতিক অবক্ষয় রোধে এবং মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম উপহার দিতে একজন আদর্শ মায়ের ভূমিকা অসীম।
বিশ্বায়নের যুগে একজন আধুনিক মা সব বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে থাকেন। কিন্তু আধুনিক যুগে অবাধ তথ্যপ্রবাহ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কুপ্রভাব এবং ভোগবাদী মানসিকতার কারণে তরুণ প্রজন্ম হতাশাগ্রস্থ হচ্ছে এবং ড্রাগের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানকে ভার্চুয়াল জগতের ইতিবাচক ব্যবহারে অভ্যস্ত করা, মানসিক বিষণ্ণতা থেকে রক্ষা করা এবং বাস্তব জীবনের জটিলতা মোকাবিলার শক্তি জোগানো একমাত্র চৌকষ মায়ের পক্ষেই সম্ভব। এজন্য কুসংস্কারমুক্ত, যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্ক একজন মা তাঁর সন্তানকে আধুনিক পৃথিবীর জন্য যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারেন।
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই পুরুষরা জীবিকার সন্ধানে বাহির হয়েছেন। আর সন্তান বড় হয়েছে মায়ের স্নেহ ও সাহচর্যে। মা-ই শিশুর প্রথম শিক্ষক এবং পরিবারই তার প্রথম শিক্ষালয়। বোদ্ধারা বলেন, বনেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষের চারিত্রিক ভিত্তির প্রথম সোপান পরিবারে। পিতার শাসনের পাশাপাশি মায়ের আচার-আচরণের সবটুকু শিশুর অবচেতন মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে। গঠনমূলক আচরণে শিশু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হয়, আর সমালোচনা ও অশান্তির মধ্যে বেড়ে উঠলে শিশু উৎশৃঙ্খল হয়। তাই শিশুর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে মা হলেন অগ্রদূত নির্মাতা।
বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক জাঁ জ্যাক রুশো তার শিক্ষা ও মানব চরিত্র গঠন সম্পর্কিত আলোচিত গ্রন্থ ˈEmile’-এ মায়ের প্রথম ও মৌলিক ভূমিকাকে সমর্থন করে বলেছেন- ²The first education is the most important, and this first education belongs incontestably to women.’’ (অর্থ: মানুষের জীবনের প্রথম শিক্ষাটিই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আর এ প্রথম ও প্রধান শিক্ষার দায়িত্ব অবিসংবাদিতভাবেই নারীর/মায়ের উপর ন্যস্ত)। সভ্যতার দৃশ্যমান অগ্রগতি অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তি নির্ভরশীল হলেও এর প্রকৃত জিয়নকাঠি মানুষের মনুষ্যত্বের ওপর। আর সেই মানবিক গুণাবলি অর্জনের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। যার চালিকাশক্তি হলেন একজন সচেতন মা। একটি আদর্শ, সংঘাতমুক্ত এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সুশিক্ষা ও সচেতন মাতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এরকম পরিবেশে গড়ে উঠা একজন সচেতন মা কেবল একটি গৃহের আলো নন, তিনি গোটা রাষ্ট্রের একজন শক্তিশালী স্টেকহোল্ডার (Stakeholder)।
লেখক: অধ্যক্ষ, নবযুগ ডিগ্রি কলেজ, কুশুরা, ধামরাই, ঢাকা।