
গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কোনো স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেই একটি দেশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ড. আলী রীয়াজ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা ঝুঁকির কথাও তুলে ধরে তিনি সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার (৭ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মুজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণকে শুধু একটি নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হলে রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহত্তর লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হয়। জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব।
তিনি বলেন, শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেই রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এসব প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে কাজ করতে হবে।
আলী রীয়াজের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হলো সাধারণ মানুষের প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধ করা এবং সরকারি সম্পদ লুট বা অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় বিদ্যমান ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগ্রহী থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের জন্য তরুণদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আলী রীয়াজ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক কাঠামো বর্তমানে বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দ্বিমেরু ও পরবর্তী একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার পরিবর্তে বিশ্ব এখন বহুমুখী শক্তির প্রতিযোগিতা ও অনিশ্চয়তার দিকে এগোচ্ছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশকের পর এতটা পরিবর্তনশীল ও অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি আর দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই টানাপোড়েন সাধারণ মানুষের জীবনযাপনেও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বা বাব-এল-মান্দেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে তার প্রভাব স্থানীয় বাজার ও পণ্যের দামে পড়তে পারে। একইভাবে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গাজায় চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকটও শুধু সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ছে।
বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করছে।
বাংলাদেশে তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলেও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, মাদাগাস্কারে তরুণদের আন্দোলন সফল হওয়ার পর রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে। সুদানে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরও বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে সামরিক শক্তির মধ্যে সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের সৃষ্টি হয়।
তিউনিসিয়ার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আরব বসন্তের পর সেখানে একাধিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে না ওঠায় পরবর্তী সময়ে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি হয়েছে।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, তিউনিসিয়া ও সুদানের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু স্বৈরাচারের পতন ঘটানোই চূড়ান্ত সাফল্য নয়; এরপর একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ।
তরুণদের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও বক্তব্য দেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, তরুণদের সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়া উচিত যুক্তি ও চিন্তার সক্ষমতা; শারীরিক শক্তি বা বলপ্রয়োগ নয়।
শিক্ষাজীবনে ‘কেন’ প্রশ্ন করার অভ্যাস বজায় রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশের পর অনেকের মধ্যে প্রশ্ন করার প্রবণতা কমে যায়। প্রচলিত ধারণাকে যাচাই ও চ্যালেঞ্জ করতে তরুণদের সবসময় যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তারুণ্যের সাহস ইতিবাচক শক্তি হলেও তা যেন ঔদ্ধত্যে পরিণত না হয়। ভিন্নমত পোষণকারী কাউকে শত্রু হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং নিজের অপছন্দের মতের পেছনে কোনো যুক্তি আছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করাই মুক্তচিন্তার পরিচয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশের প্রেক্ষাপটে তরুণদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান আলী রীয়াজ। প্রযুক্তি মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার বিকল্প হয়ে উঠছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তিকে মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। কোনো অ্যালগরিদম যেন মানুষের ভবিষ্যৎ বা সিদ্ধান্ত নির্ধারণের একমাত্র মাধ্যম হয়ে না ওঠে। এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর ঝুঁকিগুলোও বুঝতে হবে এবং মানবকল্যাণে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে গবেষণা ও একাডেমিক ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ‘আলী রীয়াজ স্নাতকোত্তর গবেষণা পুরস্কার ২০২৬’ প্রদান করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানসহ শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
তরুণ গবেষকদের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে আলী রীয়াজ বলেন, বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকেই নিতে হবে। ভবিষ্যৎ নির্মাণে শুধু আগের প্রজন্মের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সক্ষমতা ও চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।