
-মিজানুর রহমান
জন্মের পর প্রতিটি শিশুই এক একজন কৌতূহলী গবেষক। তাদের চারপাশের চেনা-অচেনা জগৎকে তারা ছুঁয়ে, দেখে এবং চিনে নিতে চায়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর এই স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসাকে যখন বারবার ‘না’ বা নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে দেওয়া হয়, তখন তার মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বা ‘রিয়েক্ট্যান্স’ (Psychological Reactance) তৈরি হয়। নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন, আর শিশুদের ক্ষেত্রে তা আরও তীব্র। তাই লালন-পালনে নেতিবাচক ‘না’ সূচক শব্দের ব্যবহার কমিয়ে ইতিবাচক বা ‘হ্যাঁ’ সূচক বার্তার মাধ্যমে শিশুকে পরিচালিত করা সবচেয়ে কার্যকর অভিভাবকত্ব পদ্ধতি।
আমেরিকান চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশু প্রতিদিন গড়ে ডজনখানেরও বেশি ‘না’ বা ‘এটা কোরো না’ জাতীয় শব্দ শোনে। ক্রমাগত এই নেতিবাচক নির্দেশনার ফলে শিশুর মস্তিষ্কে কিছু ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। যেমন,
নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ: যখন একটি শিশুকে বলা হয়, "মিথ্যা বলো না", তখন তার অবচেতন মন ‘মিথ্যা’ শব্দটিকে একটি রহস্য হিসেবে গ্রহণ করে। সে ভাবতে শুরু করে—মিথ্যা কী? কীভাবে বলতে হয়? না বললে কী হয়? ফলে মনের অজান্তেই সে নেতিবাচক বিষয়ের দিকে ধাবিত হয়।
বিদ্রোহী মনোভাবের বিকাশ: বারবার ‘না’ শুনলে শিশুরা নিজেদের স্বাধীনতাহীন মনে করে। এর ফলে তাদের মধ্যে চক্রান্ত, প্রতিহিংসা এবং জেদি আচরণ তৈরি হতে থাকে।
ভাষাগত বিভ্রান্তি: শিশুদের মস্তিষ্ক প্রধানত নির্দেশনার মূল শব্দটিকে (Action Verb) আগে গ্রহণ করে। "দৌড়াদৌড়ি কোরো না" বললে তাদের মস্তিষ্ক ‘দৌড়াদৌড়ি’ শব্দটিকে প্রসেস করে, ফলে তারা নিষেধ করার পরও আবার সেই কাজটিই করে বসে।
নেতিবাচক বাক্যকে ইতিবাচক বাক্যে রূপান্তর করলে শিশুর আচরণে ম্যাজিকের মতো পরিবর্তন আসে। নিচে কিছু বাস্তবসম্মত দৃষ্টান্ত দেওয়া হলো:
| নেতিবাচক ও নিষিদ্ধ বার্তা (যা বর্জনীয়) | ইতিবাচক ও নির্দেশনামূলক বার্তা (যা শিক্ষণীয়) | শিশুর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন |
| "কখনও মিথ্যা বলবে না।" | "সব সময় সত্য কথা বলবে, সত্যবাদীকে সবাই ভালোবাসে।" | শিশু সত্য বলার গৌরব ও নৈতিকতা শিখবে। |
| "ঘরে চিৎকার কোরো না।" | "একটু নিচু স্বরে বা মিষ্টি করে কথা বলো।" | শিশু ভদ্রভাবে কথা বলার সঠিক উপায়টি জানতে পারবে। |
| "দেওয়ালে বা টেবিলে আঁকিবুঁকি কোরো না।" | "এই নাও খাতা-পেন্সিল, এখানে সুন্দর করে ছবি আঁকো।" | শিশুর সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত না হয়ে সঠিক পথ পাবে। |
| "খাবার নিয়ে খেলা কোরো না / নষ্ট কোরো না।" | "চলো, আমরা চামচ দিয়ে লক্ষ্মী সোনাদের মতো খাবার শেষ করি।" | শিশু খাবার অপচয় না করে আনন্দের সাথে খেতে শিখবে। |
একটি শিশুর জীবনের প্রথম, সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং বিশ্বাসের প্রধান স্থল হলেন তার মা। আলবার্ট বান্দুরার ‘সোশ্যাল লার্নিং থিওরি’ (Social Learning Theory) অনুযায়ী, শিশুরা উপদেশ শুনে যতটা না শেখে, তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে চোখের সামনে বড়দের আচরণ দেখে।
অনুকরণ ও অবচেতন শিক্ষা: শিশু জন্মের পর থেকে মায়ের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটায়। মায়ের মুখের ভাষা, ধৈর্য এবং পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মায়ের ইতিবাচক আচরণ শিশু অবচেতনভাবেই নিজের মধ্যে গেঁথে নেয়। মা যদি নিজে পরিবারে সততা বজায় রাখেন, তবে শিশুকে আলাদা করে ‘সত্য কথা বলো’ শেখাতে হয় না।
আস্থার নিরাপদ আশ্রয়: শিশুরা মাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। তাই মা যখন কোনো বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে ভালোবেসে তার বিকল্প পথ বা ‘হ্যাঁ’ সূচক সমাধান দেখান, তখন শিশুর মানসিক বিকাশ সুস্থ ও চক্রান্তমুক্ত হয়।
যদিও শিশুর লালন-পালনে মায়ের ভূমিকাই মুখ্য, তবুও বাবার ইতিবাচক অংশগ্রহণ সেই প্রক্রিয়াটিকে আরও শক্তিশালী ও সুদৃঢ় করে তোলে। মা যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেন, বাবা তাতে একটি সুন্দর ভারসাম্য এনে দেন।
মায়ের বার্তার সাথে একাত্মতা: মা যখন শিশুকে কোনো ইতিবাচক নির্দেশনা দিচ্ছেন (যেমন: "চলো সোনা, আমরা খেলনাগুলো গুছিয়ে রাখি"), বাবা তখন মায়ের কথার সুর মিলিয়ে বলতে পারেন, "হ্যাঁ, চলো আমরা সবাই মিলে ঝটপট গুছিয়ে ফেলি।" বাবা যদি মায়ের সুরেই কথা বলেন, তবে শিশুর মনে কোনো দ্বিধা তৈরি হয় না।
আবেগের নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা: শিশুরা বাবাকে শক্তির প্রতীক মনে করে। বাবা যদি ঘরে রাগ বা নেতিবাচক আচরণ না করে মায়ের সাথে ইতিবাচকভাবে কথা বলেন, তবে শিশু বুঝতে পারে যে ‘হ্যাঁ’ সূচক বা শান্ত আচরণই স্বাভাবিক। এতে তার মধ্যে প্রতিহিংসা বা ষড়যন্ত্রমূলক মনোভাব তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে না।
যৌথ রোল মডেল: মা এবং বাবা যখন যৌথভাবে শিশুর সামনে ইতিবাচক ভাষা ব্যবহার করেন, তখন শিশুর মনে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা তৈরি হয়। সে একমুখী ও সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হতে থাকে।
শিশুর মন একটি নরম কাদার দলার মতো, তাকে যে ছাঁচে গড়া হবে সেভাবেই সে বড় হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিশুকে কেবল অন্যায় থেকে দূরে রাখা নয়, বরং তাকে ন্যায়ের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করা। মায়ের প্রধান দায়িত্বে এবং বাবার পরম সহযোগিতায় যদি ঘরের পরিবেশ থেকে ‘না’-এর অন্ধকার দেয়াল তুলে দেওয়া যায়, তবে প্রতিটি শিশুই হয়ে উঠবে আত্মবিশ্বাসী, সত্যবাদী ও মানবিক।
সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও মোটিভেটর