

মিজানুর রহমান
দর্পণ বা আয়নায় বস্তুর প্রতিবিম্ব নিখুঁতভাবে প্রতিফলিত হয়। অর্থাৎ, একটি আয়নার সামনে যা কিছু থাকে বা রাখা হয়, তার সবকিছুর স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি সেখানে দৃশ্যমান হয়। ঠিক তেমনি, প্রতিটি মানুষই এক একটি জীবন্ত আয়নার মতো। বাহ্যিক অবয়ব বা পোশাক-পরিচ্ছদে মানুষ হয়তো নিজেকে ঢাকতে পারে, কিন্তু তার অন্দরমহল, স্বভাব, এবং চালচলন বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারে না।
একজন মানুষের মধ্যে তার ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক আবহ, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, বংশগত ঐতিহ্য, সামাজিক সংস্কৃতি এবং রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতির পরিচয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেসে ওঠে। মানুষের দৈনন্দিন আচার-আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি এবং প্রতিটি কর্ম বলে দেয় সে কেমন পরিবারে জন্ম নিয়েছে, কেমন পরিবেশে সে তিল তিল করে বড় হয়েছে এবং তার মা-বাবা তাকে কী ধরনের মূল্যবোধ ও শিক্ষা দিয়েছেন।
সমাজে প্রায়ই মানুষকে তার ধন-সম্পদ, বিত্ত-বৈভব বা বাহ্যিক ক্ষমতার মাপকাঠিতে বিচার করা হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে একজন মানুষ ধনাঢ্য কি দরিদ্র—সেটি কখনো তার আসল পরিচয় হতে পারে না।
আসল কথা হলো স্বভাবগত দিক থেকে মানুষটি কেমন, তার কর্ম কতটা জনকল্যাণমুখী এবং তার মনমানসিকতা কতটা উদার। সব মিলিয়ে মানুষটি একজন ভালো মানুষ কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অর্থবিত্ত ক্ষণস্থায়ী, যা আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষের ভালো স্বভাব ও চরিত্র মৃত্যুর পরেও অমর হয়ে থাকে।
একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য পাহাড়সম সম্পদের মালিক হওয়া বা ধনাঢ্য হওয়া মোটেও জরুরি নয়; জরুরি হলো নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া। মানুষের মানবতার চর্চা এবং মানবিক মূল্যবোধই তাকে সমাজে সত্যিকারের মর্যাদার আসনে আসীন করে।
একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক মূল্যবোধের কোনো বিকল্প নেই। আর এই শিক্ষার ভিত্তি স্থাপিত হয় শিশুর শৈশবে, যার মূল সূতিকাগার হলো তার পরিবার।
পরিবারের পরিবেশ যত সুন্দর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ হবে, সন্তানের মানসিক বিকাশ তত বেশি সুষম ও মার্জিত হবে। গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সত্যবাদিতা—এই গুণগুলো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে শেখানো যায় না, এগুলো পরিবার থেকেই রক্তে মিশে যায়।
প্রবাদ আছে, "একটি ভালো মা শতটি শিক্ষকের সমান।" মায়ের কোলই শিশুর প্রথম বিদ্যালয় এবং মা হচ্ছেন তার জীবনের প্রধান শিক্ষক।
একটি শিশু যখন কথা বলতে শেখে, পথ চলতে শেখে, তখন সে তার মায়ের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, কথা এবং আচার-আচরণ অন্ধের মতো অনুকরণ করে। মা যখন সততা, ধৈর্য, পরোপকার এবং ভালোবাসার শিক্ষা দেন, তা শিশুর অবচেতন মনে চিরস্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।
মায়ের স্নেহের কোমল ছায়া এবং সুশাসনের মাধ্যমে একটি শিশুর মেরুদণ্ড শক্ত হয়। মা তার ত্যাগের মাধ্যমে সন্তানকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে শেখান, যা পরবর্তীতে তাকে একজন সত্যিকারের মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে যখন একজন শিশু বাইরে পা রাখে, তখন তার চরিত্র গঠনে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সমাজ ও বন্ধু-বান্ধব বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে।
ভালো সংঘ মানুষকে মহৎ করে তোলে, আর মন্দ সংঘ তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। তাই সমাজ ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সুস্থতা রক্ষা করা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
ব্যক্তির আচার-আচরণ কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না; তা একটি জাতির সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যেরও প্রতিনিধিত্ব করে। একজন সুনাগরিকের প্রতিটি কাজ দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে।
পরিশেষে বলা যায়, মানুষের আসল সৌন্দর্য তার বাহ্যিক রূপ বা আড়ম্বরপূর্ণ পোশাকে নয়, বরং তার অন্তরের পবিত্রতা ও নৈতিক চরিত্রে নিহিত। আমরা যদি একটি বৈষম্যহীন, হিংসামুক্ত এবং মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে শেকড়ের দিকে অর্থাৎ পারিবারিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক শিক্ষার চর্চায়।
আসুন, ব্যক্তিগত স্বার্থপরতা ভুলে পারিবারিক অনুশাসন, মানবতা ও নৈতিক শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে ধারণ করি। প্রতিটি মানুষ যদি নিজেকে সততা ও সুশিক্ষার আয়নায় পরিশুদ্ধ করতে পারে, তবেই আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।
লেখক: সাংবাদিক, সমাজকর্মী ও মোটিভেটর