
একটি ডিমের দাম ১৫ টাকা হওয়াকে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না, অথচ প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে জীবনযাপনের ব্যয়। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাতে নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নাহিদ ইসলাম এসব মন্তব্য করেন।
তিনি লেখেন, ‘একটা ডিম ১৫ টাকা’ এই কথাটিই বর্তমানে দেশের বিপুলসংখ্যক নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব পরিবারের নিয়মিত মাছ-মাংস কেনার সামর্থ্য নেই, তাদের খাদ্যতালিকায় ডিম গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিনের উৎস হিসেবে কাজ করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল কিংবা মেসে থাকা ব্যাচেলর তরুণদের জন্যও ডিম সহজলভ্য ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী খাবার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের দৈনন্দিন খাবারের খরচও বাড়ছে।
পোস্টে তিনি বলেন, ডিমের দাম একা বাড়েনি। চাল, আটা, তেল, চিনি, মুরগি, মাছ ও সবজিসহ প্রায় প্রতিটি মৌলিক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। তাঁর দাবি, ব্রয়লার মুরগির কেজি এখন ২০০ টাকা এবং কয়েক দিন আগেই দুধের দামও বেড়েছে। অথচ মানুষের আয় সে অনুযায়ী বাড়েনি।
নাহিদ ইসলাম নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করেন বাজেটের আকার ও সরকারের ব্যয়নীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য এবং সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক চাঁদাবাজি।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমান মেগা প্রজেক্টকে ‘মেগা দুর্নীতি’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। অথচ মেগা প্রজেক্ট ও বিভিন্ন কার্ড চালুর জন্য প্রায় ২০ শতাংশ বড় বাজেট করা হয়েছে। নাহিদ ইসলাম বলেন, অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি না থাকায় এবং ধনীদের কর ফাঁকি বন্ধ বা তাদের ওপর কর বাড়ানোর কার্যকর পরিকল্পনা না থাকায় অতিরিক্ত অর্থের জোগান শেষ পর্যন্ত ভ্যাট বাড়ানো, ঋণ নেওয়া অথবা টাকা ছাপানোর মাধ্যমে করতে হবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যাট বাড়লে সরাসরি পণ্যের দাম বাড়ে, টাকা ছাপালে মূল্যস্ফীতি বাড়ে এবং ঋণের সুদও ভবিষ্যতে পরিশোধ করতে হয়।
জ্বালানি নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়লে সেচ, পোলট্রি, মাছ চাষ, হিমাগার, পণ্য পরিবহন, দোকানসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচের চাপ ভোক্তার ওপরই পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক চাঁদাবাজির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব কারণে উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক বেশি দামে সাধারণ মানুষকে পণ্য কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় ১০ শতাংশ বাড়লে ধনীদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক কম পড়ে। কিন্তু নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে একই হারে ব্যয় বাড়া তাদের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত তৈরি করে কোন প্রয়োজনটি বাদ দিলে সংসার চালানো সম্ভব হবে।
তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প নীতি নেওয়ার সুযোগ ছিল বলেও দাবি করেন নাহিদ। তিনি বলেন, এনসিপির নির্বাচনী ইশতেহার ও ছায়া বাজেটে ধনীদের কর ফাঁকি বন্ধ এবং অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রজেক্ট এড়িয়ে অর্থের সংস্থান করে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব তা দেখানো হয়েছে।
তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ কমানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহার এবং পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানিতে বাড়তি ভর্তুকি দেওয়া। তবে সরকার এসব পথে হাঁটেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সরকারের নীতি থেকে কারা সুবিধা পেতে পারে, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কিংবা মেগা প্রজেক্টের উদ্বোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রচারের সুযোগ পাবেন। জ্বালানি খাত বেসরকারি করা হলে বিএনপি ও তাদের ঘনিষ্ঠ বড় ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ পেতে পারেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে মেগা প্রজেক্টের বড় অঙ্কের কমিশন থেকে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজনদের সুবিধা পাওয়ার অভিযোগও করেন নাহিদ।
পোস্টের শেষ দিকে নিম্নবিত্ত পরিবারের খাদ্যসংকটের চিত্র তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম লেখেন, কোটি মা হয়তো রাতে ১৫ টাকার একটি ডিম ভেজে কয়েক ভাগ করে সন্তানদের পাতে তুলে দেবেন।