
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব এবার স্পষ্ট হয়ে উঠছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সবজির দাম বাড়িয়েছেন। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে পটোল, ঢ্যাঁড়শ, বেগুন, ঝিঙা, ধুন্দল ও করলাসহ কয়েকটি সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে সবজি আনা-নেওয়ার পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পাইকারি বাজারেও কিছু পণ্যের দাম বাড়ায় খুচরা পর্যায়ে তার প্রভাব পড়ছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, তেলের দাম বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে কাজে লাগিয়ে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় বেশি হারে সবজির দাম বাড়ানো হচ্ছে।
ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতার প্রত্যাশার মধ্যেই নতুন করে ভোক্তার ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।
রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, এক সপ্তাহ আগেও যে লম্বা বেগুন ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে, এখন বাজারভেদে সেটি ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
একইভাবে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরের পটোল ও ঢ্যাঁড়শ এখন ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। করলার দামও বেড়েছে। আগে ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজিতে পাওয়া গেলেও এখন মানভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ঝিঙা ও ধুন্দলসহ আরও কয়েক ধরনের সবজির দামও কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে বাজার ঘুরে দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে পাইকারি বাজারে সবজির দাম বৃদ্ধির বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
মহখালী কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা কবির বলেন, পরিবহন ব্যয় বেড়েছে এবং পাইকারি বাজারেও সবজির দাম বেড়েছে। ফলে বেশি দামে পণ্য কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে।
আরেক ব্যবসায়ী রায়হান আলী জানান, মাদারীপুর থেকে যাত্রাবাড়ীতে বেগুন পরিবহনে আগে মাঝারি ট্রাকের ভাড়া প্রায় ১৮ হাজার টাকা ছিল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর সেই ভাড়া বেড়ে প্রায় ২১ হাজার টাকা হয়েছে। তাঁর মতে, বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পণ্যের খুচরা দামে পড়াটাই স্বাভাবিক।
ব্যবসায়ীদের যুক্তি থাকলেও সবজির দাম বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্রেতারা। তাঁদের বক্তব্য, পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্যের দামে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু কোনো কোনো সবজির ক্ষেত্রে একবারে কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
শ্যামবাজারে বাজার করতে আসা চাকরিজীবী হামিদ বলেন, তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ কিছুটা বাড়বে এটি স্বাভাবিক। কিন্তু একই সঙ্গে কোনো কোনো সবজির দাম ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে যাওয়া স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বাজার তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো করে দাম বাড়াচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরেক ক্রেতা বলেন, আগে যে পরিমাণ টাকা নিয়ে বাজারে গেলে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনা যেত, এখন একই টাকায় তার তুলনায় অনেক কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সীমিত আয়ের মানুষের ওপর এর বড় প্রভাব পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইনও বাজারে অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ তুলেছেন।
ঢাকা মেইলকে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়াকে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যেখানে দুই টাকা দাম বাড়ানোর কথা, সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তবে তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেই পড়বে। শিল্প-কারখানা, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় বাড়বে এবং এর একটি অংশ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, কোনো পণ্যের পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারদর কতটা বাড়তে পারে, সেটি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পরিবহন ব্যয়ের প্রকৃত বৃদ্ধি এবং বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখাও জরুরি।
এর আগে গত ২০ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ায়। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকেই বিভিন্ন খাতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কথা জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে প্যাকেটজাত তরল দুধের দাম লিটারে ১০ টাকা পর্যন্ত এবং আটা-ময়দার দাম কেজিতে প্রায় ৫ টাকা পর্যন্ত বাড়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
এবার কাঁচাবাজারে সবজির দাম বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি প্রভাব দৃশ্যমান হলো।
অন্যদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না। সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথাও অসঙ্গতি দেখা দিলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে বাজারের সাম্প্রতিক চিত্র বলছে, সবজির ক্ষেত্রে এরই মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। ডিম, ব্রয়লার মুরগি ও চালের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও বিভিন্ন সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সবজির দাম বৃদ্ধির পেছনে পরিবহন ব্যয় কতটা দায়ী এবং ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম বাড়াচ্ছেন কি না—এখন মূলত এই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির বাস্তব প্রভাব হিসেবে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে। কিন্তু সেই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাত্রার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বাজার তদারকি ও সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের তথ্য যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরার আগেই সবজির দাম নতুন করে বাড়তে থাকায় সীমিত আয়ের মানুষের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।