
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর এবার বাসভাড়াও সমন্বয় করেছে সরকার। দূরপাল্লা ও মহানগর—উভয় ধরনের বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিবহন মালিকদের বৈঠকের পর নতুন ভাড়া নির্ধারণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সা।
গত রোববার সরকার ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ায়। নতুন দর অনুযায়ী ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার যুক্তিতে বাসভাড়া সমন্বয়ের দাবি ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।
জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর সোমবার বাস মালিকদের পক্ষ থেকে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের প্রস্তাবে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২০ পয়সা এবং মহানগর এলাকায় ১৮ পয়সা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল।
সে হিসাবে দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৩ পয়সা করার প্রস্তাব ছিল। শেষ পর্যন্ত উভয় ক্ষেত্রেই ১৭ পয়সা করে বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তে দূরপাল্লার বাসের প্রতি কিলোমিটার ভাড়া বেড়েছে ১৭ পয়সা। অর্থাৎ ১০০ কিলোমিটার যাত্রায় কেবল নির্ধারিত কিলোমিটারভিত্তিক হিসাবে প্রায় ১৭ টাকা বাড়তি ভাড়া যুক্ত হবে।
একইভাবে মহানগর এলাকায় ১০ কিলোমিটার যাত্রায় কিলোমিটারভিত্তিক হিসাবে বাড়তি ভাড়া হবে ১ টাকা ৭০ পয়সা। তবে কোনো নির্দিষ্ট রুটে মোট ভাড়া কত হবে, তা যাত্রাপথের দূরত্ব ও প্রযোজ্য ভাড়ার কাঠামোর ওপর নির্ভর করবে।
দূরপাল্লার বাসের সরকারি ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে ৫২ আসনের বাসকে ভিত্তি ধরা হলেও বাস্তবে অনেক বাসে আসনসংখ্যা কম। অনেক নন-এসি বাসে ৪০টি কিংবা ৩২ থেকে ৩৬টি আসন থাকে।
আসনসংখ্যা কম হলে প্রতি যাত্রীর ওপর কিলোমিটারভিত্তিক ভাড়া তুলনামূলক বেশি পড়ে। সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫২ আসনের বাসে বর্তমান ২ টাকা ২৩ পয়সা কিলোমিটার ভাড়ার বিপরীতে ৪০ আসনের বাসে হিসাবটি প্রায় ২ টাকা ৯০ পয়সা পর্যন্ত দাঁড়ায়। নতুন ২ টাকা ৪০ পয়সা হার কার্যকর হলে ৪০ আসনের ক্ষেত্রে এই হার আরও বাড়তে পারে।
চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাসভাড়া সমন্বয় করা হয়েছিল। তখন দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৫৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। মহানগর এলাকায় মিনিবাসের ভাড়াও তখন বাড়ানো হয়।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাসভাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকছে না। পণ্য পরিবহনেও ব্যয় বাড়ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় পণ্য আনার ক্ষেত্রে ট্রাক ভাড়া বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর ফলে পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি চাপ শেষ পর্যন্ত পণ্যের বাজারদরেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির পর চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন রুটে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। কিছু রুটে ৩ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগের কথা জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
নতুন ভাড়া কার্যকর হওয়ায় প্রতিদিন বাসে চলাচলকারী যাত্রীদের পরিবহন ব্যয় বাড়বে। বিশেষ করে নিয়মিত দূরপাল্লার যাত্রী এবং প্রতিদিন গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল কর্মজীবীদের মাসিক যাতায়াত ব্যয়ে এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে নতুন ভাড়ার পাশাপাশি নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না, তা নজরদারি করা এবং নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবায়ন করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খাতে একের পর এক ব্যয় বাড়ছে। প্রথমে বেড়েছে জ্বালানি ব্যয়, এরপর বাসভাড়া সমন্বয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বাড়ার তথ্য এসেছে।
ফলে নতুন ভাড়ার কাঠামো যাত্রী ও পরিবহন মালিক উভয়ের ওপরই কী ধরনের প্রভাব ফেলে তা নির্ভর করবে জ্বালানি ব্যয়, যাত্রীসংখ্যা, পরিচালন ব্যয় এবং নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে তার ওপর।