
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন, মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসান এ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ২টার দিকে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান।
পুলিশ সুপার বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেই জিডির সূত্র ধরেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে। পরে বিভিন্ন তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে অগ্রসর হয় পুলিশ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল মিলে অপ্রতিমের মাথায় বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করেন। একপর্যায়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর ফাহাদ ও কামরুল অপ্রতিমের আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় যায় অপ্রতিম। এরপর থেকে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
রাত পর্যন্ত অপ্রতিম বাড়িতে না ফেরায় তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত একটি জিডি করেন।
পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি সানন্দা গ্রামের একটি ঝোপ থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রথমে তুহিনকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পর পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ও মো. কামরুল হাসানকে আটক করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এই তিনজনের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন এসপি।
এ ছাড়া সিয়াম নামে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা কতটা রয়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার মধ্যরাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। ওই মামলায় তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
রোববার সকাল ১০টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও স্থানীয় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
পরে মরদেহ কোটবাড়ি গন্ধমতি ঈদগাঁও মাঠে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে বাড়ির পাশের কবরস্থানে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিতের দাবিতে রোববার সকালে আন্দোলনে নামেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তারা কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল ব্যাহত হয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
পরে দুপুর ১টার দিকে চার দফা দাবি তুলে মহাসড়ক ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে অপ্রতিম হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতার করে ৬০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ এবং ফাঁসির রায় কার্যকর করা।
এ ছাড়া পুলিশের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে কুমিল্লার পুলিশ সুপার, আদর্শ সদর ও সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং প্রয়োজনে সাঙ্গিশ্বর পুলিশ ফাঁড়ি কুবির পাশে স্থানান্তরের দাবিও রয়েছে।
অন্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া, পুরো কুবি এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত ও উদ্ধারে প্রযুক্তিনির্ভর বিশেষ ইউনিট গঠন।
পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, অপ্রতিম হত্যার ঘটনার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং ঘটনায় জড়িতদের ভূমিকা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।